সরকারের আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়াচ্ছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই ব্যাংক খাত থেকে নিট ৪৭ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এতে পুরো অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪৩ শতাংশ ইতিমধ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।
সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ার পেছনে রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতার পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন-ভাতা পরিশোধের চাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের কারণে আগামী দিনগুলোতে সরকারি ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু অক্টোবর মাসেই ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে মোট ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এক মাসে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ।
এর আগে চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে ৫৬ হাজার কোটি, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি এবং সেপ্টেম্বরে প্রায় ৪১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল সরকার।
তবে এসব পরিসংখ্যান সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ নয়। কারণ, নতুন করে ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি আগের ঋণের মেয়াদ পূর্ণ হলে তা পরিশোধ করতে হয়। পুরোনো বিল ও বন্ড পুনরায় ইস্যু করার বিষয়টিও হিসাবের মধ্যে থাকে। এসব সমন্বয়ের পর অক্টোবর শেষে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা।
আয় কম, ব্যয়ের চাপ বেশি
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতার তুলনায় রাজস্ব আয়ের পরিমাণ কম হওয়ায় ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের অতিরিক্ত চাপও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে সামনের সময়ে সরকারের ঋণের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম মনে করেন, অর্থবছরের শেষ দিকে সরকারের ব্যয়ের চাপ সাধারণত বেশি থাকে। এ কারণে ওই সময়ে ঋণ গ্রহণও বাড়ে।
তিনি জানান, অক্টোবর মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া হলেও আগের বিল ও বন্ডের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তাঁর মতে, এই পরিশোধের ফলে বাজারে অর্থের সরবরাহ এবং রিজার্ভ মানি কমবে। তাই মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব খুব বেশি হওয়ার কথা নয়।
তবে অর্থনীতির গতি বাড়াতে ব্যাংকগুলোকে বেসরকারি খাতে ঋণ ও বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে বলেও তিনি মনে করেন।
বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। এতে সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এর মধ্যে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই এই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪৩ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে। ফলে বাকি সময়ে সরকারের ঋণ গ্রহণের চাহিদা কতটা বাড়ে, তা নিয়ে অর্থনৈতিক মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে রাজস্ব আদায়েও বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। ফলে সরকারের আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে।
বেতন-ভাতা পরিশোধেও বিশেষ ঋণ
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন-ভাতা পরিশোধের অর্থ জোগাতে ব্যাংক খাত থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত সোমবার ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে সরকার।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণের জোগান দেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই দায়িত্ব পালন করছে।
অর্থনীতির জন্য কী বার্তা দিচ্ছে এই ঋণ?
সরকারের ব্যাংকঋণ গ্রহণ একদিকে বাজেটের ঘাটতি পূরণ ও নিয়মিত ব্যয় পরিচালনায় সহায়তা করছে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি ও বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের ঋণের চাহিদা থাকা অবস্থায় সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তবে ঋণ গ্রহণের পাশাপাশি পুরোনো ঋণ পরিশোধের পরিমাণ এবং বাজারে সামগ্রিক অর্থের সরবরাহও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। রাজস্ব সংগ্রহে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হলে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। এতে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

