কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে গত ১৭ অক্টোবর অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর পর সেন্টমার্টিন দ্বীপের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটিতে ২০০টির বেশি হোটেল ও রিসোর্ট আছে। এর বেশির ভাগই কাঠ ও বাঁশের মতো সহজে আগুন ধরে এমন উপকরণে তৈরি। কিন্তু পুরো দ্বীপে ফায়ার সার্ভিসের কোনো স্টেশন নেই। মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে হওয়ায় জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোরও সুযোগ নেই।
বঙ্গোপসাগরে টেকনাফ উপকূল থেকে প্রায় নয় কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপে স্থানীয় বাসিন্দা প্রায় ১০ হাজার। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটক সেখানে যেতে পারবেন। পর্যটকেরা গড়ে দুই দিন থাকলে দ্বীপে প্রতিদিন অন্তত ১৫ হাজার মানুষ অবস্থান করবেন। এত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় উদ্বিগ্ন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, ইকো রিসোর্টের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার করা এখন জরুরি।
আগেও এই দ্বীপে ঝুঁকির আভাস মিলেছিল। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি ভোররাতে পাশাপাশি থাকা বিচ ভ্যালি, কিংশুক ও সাইরি নামের তিনটি ইকো রিসোর্টে আগুন লাগে। এতে ২৬টি কক্ষ পুড়ে যায়। সব পর্যটক সময়মতো বের হতে পারায় কেউ হতাহত হননি। তবে স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পানির পাম্প দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেও সফল হননি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রিসোর্ট তিনটি পুড়ে যায়।
সেন্টমার্টিনের স্থানীয় বাসিন্দা ও মারমেইড রিসোর্টের মালিক তৈয়ব উল্লাহ বলেন, চোখের সামনেই রিসোর্টগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল, সৌভাগ্যক্রমে সেদিন কেউ হতাহত হননি। তাঁর রিসোর্টে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র আছে, কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই সেগুলো সঠিকভাবে চালাতে জানেন না। তাই রিসোর্টের মালিক ও কর্মীদের অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর তিনি জোর দেন।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম জানান, আগুন নেভানোর জন্য দ্বীপে অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। ছোট অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রই একমাত্র ভরসা। স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যটন ব্যবসার প্রসার ঘটলেও আগুনে প্রাণহানি ঠেকাতে জেলা প্রশাসন বা ফায়ার সার্ভিসের জোরালো কোনো উদ্যোগ এখনো চোখে পড়েনি।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান সায়েম জানান, গত সপ্তাহে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের সঙ্গে এক বৈঠকে জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান সেন্টমার্টিনে একটি মিনি ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে মৌখিকভাবে অনুরোধ করেছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হয়নি।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, কয়েক বছর আগে সেন্টমার্টিনে স্টেশন স্থাপনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তাতে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তাঁর ভাষ্য, ফায়ার সার্ভিসের ব্যবস্থায় মিনি স্টেশন বলে কিছু নেই; দ্বীপে একটি পূর্ণাঙ্গ স্টেশন প্রয়োজন।
এদিকে টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সুমন জানান, হোটেল ও রিসোর্টগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনে মঙ্গলবার ১২টি দল সেন্টমার্টিনে পৌঁছেছে। দলগুলো বিভিন্ন স্থাপনার অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ও জরুরি অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা পরীক্ষা করবে। পাশাপাশি আগুন প্রতিরোধ ও নেভানোর পদ্ধতি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করতে নানা কার্যক্রমও চালাবে।
১ নভেম্বর সেন্টমার্টিনে পর্যটন মৌসুম শুরু হলেও এ রুটে চলাচলের জন্য এখনো কোনো জাহাজ ছাড়পত্র পায়নি। ফলে পর্যটকেরা এখন পর্যন্ত দ্বীপে যেতে পারছেন না। মৌসুম চলবে আগামী বছরের ১৫ মার্চ পর্যন্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজ চলাচল শুরুর আগেই স্থায়ী অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে ডিসেম্বরের ভরা মৌসুমে ঝুঁকি আরও বাড়বে।

