নারায়ণগঞ্জে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও সাম্প্রতিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের এক শীর্ষ নেতার বক্তব্য। নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ বলেছেন, সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কারখানা মালিকদের যে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়, তা না হলে শ্রমিকদের মাসিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দেওয়া সম্ভব হতো।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নগরীর চাঁদমারি এলাকায় চেম্বার ভবনে শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে একটি জরুরি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি ব্যবসায়ীদের বর্তমান আর্থিক চাপের চিত্র তুলে ধরেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ও চেম্বারের বর্তমান সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু।
মাসুদুজ্জামানের ভাষ্য, সরকারি বিভিন্ন সেবা পেতে ব্যবসায়ীদের প্রতি বছর লাখ লাখ, এমনকি কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয়। এই ব্যয়ের চাপে মালিকরা এখন কার্যত কোণঠাসা। তাঁর মতে, এই অর্থ শ্রমিকদের মজুরিতে যুক্ত হলে তাঁদের জীবনমান উন্নত হতো। তিনি মনে করেন, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে যদি ওয়ান স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করা যায়, তাহলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর সক্ষমতা ব্যবসায়ীদের তৈরি হবে।
শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতার ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও সভায় প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় নাগরিক পার্টি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ব্যবসায়ী সমাজের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ, রহস্যজনক ও হতাশাজনক মনে হয়েছে। বিরোধী দল হিসেবে তাদের কাছ থেকে ভিন্ন আচরণ প্রত্যাশিত ছিল বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, এই দেশ শেষ পর্যন্ত সবারই। তাই সমস্যার সমাধানও সবাইকে মিলেই করতে হবে।
গত তিন দিনের পরিস্থিতিকে তিনি একেবারে নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করেন। তাঁর অভিযোগ, মজুরি কাঠামো নিয়ে আলোচনার জন্য ওয়েজেস বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ঠিক সেই দিনই এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এই ঘটনার সঙ্গে কোনো মালিকের সংশ্লিষ্টতা ছিল না এবং মালিকদের কোনো মতামতও এতে প্রতিফলিত হয়নি। তিনি দাবি করেন, শ্রমিকদেরও এ বিষয়ে কোনো সম্মতি ছিল না।
মজুরি নিয়ে চলমান দাবির প্রসঙ্গেও কথা বলেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কিছু শ্রমিক নেতা ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবি তুলেছেন। কিন্তু মজুরির পরিমাণ ঠিক করবে মজুরি বোর্ড। অথবা বিষয়টি বিবেচনা করেই বোর্ড গঠন করা হবে। সেই প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় না দিয়েই আগের দিন প্রায় ৬৭ থেকে ৬৮টি কারখানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয়। তাঁর দাবি, এর পেছনে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের তথ্য তাঁদের কাছে এসেছে।
মাসুদুজ্জামান আরও স্পষ্ট করেন, শ্রমিকদের আন্দোলন প্রতিহত করা ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্য ছিল না। তাঁর মতে, পরিস্থিতি সামলাতে রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত বক্তব্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন ছিল, যা পাওয়া যায়নি।
শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে একসঙ্গে এতগুলো কারখানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ-আস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে ন্যায্য মজুরির দাবি শ্রমিকদের বাস্তব জীবনের সংকট থেকেই উঠে আসছে। ফলে মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে আলোচনার পথে সমাধান খোঁজাই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বিকল্প বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ব্যবসায়ী নেতার বক্তব্যে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো তাঁরই দাবি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়া এখনো জানা যায়নি।
শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের এই টানাপোড়েনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকার, ব্যবসায়ী সংগঠন, শ্রমিক প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয় এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে।

