চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি হারে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও ভোগ্যপণ্য আমদানিতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরও বড় হয়েছে। একই সময়ে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও বৈদেশিক লেনদেনের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৪৭ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫৭১ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ১৭৬ কোটি ডলার।
প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশ মোট ১ হাজার ৯৩৩ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ। বিপরীতে রপ্তানি আয় হয়েছে ১ হাজার ১৮৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি।
এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, রপ্তানি আয় বাড়লেও আমদানির প্রবৃদ্ধি তার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে বৈদেশিক বাণিজ্যে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান আরও বিস্তৃত হয়েছে। আমদানি ব্যয়ের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়িয়ে ডলারের বাজারেও চাপ সৃষ্টি করছে।
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব এসেছে জ্বালানি খাত থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪২২ কোটি ডলারের বেশি। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ খাতে ব্যয় ছিল ২০৬ কোটি ডলারের কম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১০৫ শতাংশ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এই ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়লে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে একই পরিমাণ পণ্য কিনতেও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। ফলে জ্বালানি আমদানির অতিরিক্ত খরচ দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
শুধু জ্বালানি নয়, ভোগ্যপণ্য আমদানিতেও ব্যয় বেড়েছে। প্রথম প্রান্তিকে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে খরচ হয়েছে ১৪০ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে প্রাথমিক পণ্যের আমদানি প্রায় ২৩ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৩৫৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
তবে সব ধরনের আমদানিতে একই প্রবণতা দেখা যায়নি। তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে মাত্র ২ দশমিক ৭০ শতাংশ। এ খাতে মোট আমদানি ব্যয় হয়েছে ৪৬১ কোটি ডলার।
অন্যদিকে মূলধনি পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মূলধনি পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ২৪৬ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৬০ শতাংশ কম। অন্যান্য পণ্য আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ।
মূলধনি পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ার বিষয়টি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে এসব পণ্যের সম্পর্ক রয়েছে। তবে শুধু আমদানি কমার তথ্য দিয়ে বিনিয়োগের সামগ্রিক অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না। এ ক্ষেত্রে শিল্প খাতের চাহিদা, বিনিয়োগ পরিস্থিতি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সূচকও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয়েও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি রয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে দেশে মোট ৮৫৯ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১৩ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি।
তবে প্রবাসী আয় বাড়লেও তা আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির চাপ পুরোপুরি সামাল দিতে পারেনি। এর ফলে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে ঘাটতি আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৩৩ কোটি ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল মাত্র ৮২ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়েছে ৫১ কোটি ডলার।
একই সময়ে আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্তও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আর্থিক হিসাবে ১৮০ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত থাকলেও এবার তা কমে মাত্র ৩২ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। প্রথম প্রান্তিকে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় ১ কোটি ডলার কমে ৩৫ কোটি ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে অন্যান্য বিনিয়োগের পরিমাণ ১৪৮ কোটি ডলার থেকে কমে মাত্র ৪ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিদেশি ঋণপ্রবাহেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের পরিমাণ কমে হয়েছে ৫৪ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ধরনের ঋণের পরিমাণ ছিল ১০৪ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই খাতে ঋণপ্রবাহ প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।
এ ছাড়া অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি নিট ঋণের পরিমাণ ঋণাত্মক ১৭ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এই খাতে প্রায় ৮ কোটি ডলারের ইতিবাচক প্রবাহ ছিল।
তবে বাণিজ্যিক ঋণসুবিধার ক্ষেত্রে কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেছে। প্রথম তিন মাসে বাণিজ্যিক ঋণসুবিধার পরিমাণ আগের অর্থবছরের ১০৮ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ১৩৪ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের বিভিন্ন খাতে দুর্বলতার কারণে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১৬ কোটি ডলারে। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই হিসাবে ৮৫ কোটি ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত থেকে ঘাটতির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে এই পরিবর্তন দেশের ডলারের বাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দামও বেড়েছে। গত তিন দিন ধরে ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতি ডলার লেনদেন হয়েছে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সায়। এর আগের দুই দিন এই দর ছিল ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা।
অক্টোবরের শুরুতে আন্তব্যাংক বাজারে প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২৩ টাকা। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে অক্টোবরের শেষ কর্মদিবসে তা ১২৩ টাকা ৯৯ পয়সায় পৌঁছায়।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় দেড় বছর আন্তব্যাংক বাজারে ডলারের বিনিময়হার ১২১ টাকা থেকে ১২২ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও ডলারের চাহিদা বাড়ায় সেই স্থিতিশীলতায় পরিবর্তন এসেছে।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ সামাল দিতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রিও শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৪ নভেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে। এর আগের সপ্তাহে আরও ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বাজারে সরবরাহ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক এর আগে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় তিন বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার বিক্রি করেছিল। এর ফলে দেশের রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
২০২১ সালের আগস্টে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তা কমে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তবে এরপর রিজার্ভ পরিস্থিতিতে উন্নতি দেখা দেয়।
চলতি বছরের ২৯ জুন রিজার্ভ আবারও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে তা আরও বেড়ে ৩৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আবারও রিজার্ভ কমতে শুরু করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে।
আমদানি ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহের দুর্বলতা এবং ডলারের বিনিময়হারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির অতিরিক্ত ব্যয় সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি খরচ বাড়লে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে ডলারের দাম বৃদ্ধি আমদানিনির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি থাকা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক দিক। তবে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের তুলনায় এসব খাতের আয় কতটা বাড়ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে আমদানি ব্যয়ের চাপ দ্রুত বাড়ছে। রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পেলেও বাণিজ্য ঘাটতি, চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যের অবনতি অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আগামী মাসগুলোতে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয়ের গতি, রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের ওপর দেশের ডলারের বাজার ও রিজার্ভ পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।

