দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও কমে ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমেছে। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি বিল পরিশোধ এবং ব্যাংকগুলোর কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রির কারণে রিজার্ভে এই পতন ঘটেছে। প্রায় পাঁচ মাস পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্দেশিত পদ্ধতিতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলারে। এর আগে ৪ নভেম্বর রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে এই হিসাবে রিজার্ভ কমেছে ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে সর্বশেষ গত ২৩ মে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে ছিল। ওই সময় রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২৯ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। এরপর রিজার্ভ কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও নভেম্বরের শুরুতে আবারও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত হিসাবপদ্ধতি অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে। গত ৪ নভেম্বর এই হিসাবে রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। ফলে প্রচলিত পদ্ধতিতে রিজার্ভ কমেছে ২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।
রিজার্ভ কমার অন্যতম কারণ হিসেবে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের আমদানি বিল পরিশোধকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ দুই মাসের দায় মেটাতে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের মাধ্যমে ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রির কারণেও রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন দক্ষিণ এশিয়া ও আশপাশের কয়েকটি দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তির একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা এই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। সদস্যদেশগুলোর মধ্যে আমদানি-রপ্তানির পাওনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়। সাধারণত প্রতি দুই মাস পরপর এসব লেনদেনের অর্থ পরিশোধ করা হয়।
এদিকে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময়হার স্থিতিশীল রাখতে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে ডলার বিক্রি বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ৩ নভেম্বর ব্যাংকগুলোর কাছে রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ডলার বিক্রি করা হয়। এর আগে ২৮ অক্টোবর বিক্রি করা হয়েছিল আরও ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এই দুই দিনেই মোট ২২ কোটি ২০ লাখ ডলার বাজারে সরবরাহ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
চলতি ২০২৬ অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি কেনার পর গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ডলার বিক্রি শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই দিন ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার বিক্রির মাধ্যমে বাজারে হস্তক্ষেপ শুরু হয়। মূলত ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় টাকার ওপর তৈরি হওয়া চাপ সামাল দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির ঋণপত্রের দায় পরিশোধে ব্যাংকগুলোর ডলারের চাহিদা বেড়েছে। এর প্রভাবে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি ডলারের দাম ১২৩ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে বেড়ে বুধবার নাগাদ ১২৪ টাকা ৬০ পয়সায় পৌঁছায়।
এর আগে দীর্ঘ সময় ডলারের বিনিময়হার তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরের বেশি সময় ধরে প্রতি ডলারের দাম ১২৩ টাকার নিচে অবস্থান করছিল। কিন্তু জুনের পর থেকে বিনিময়হারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিতে শুরু করে।
ব্যাংকের পাশাপাশি নগদ ডলারের বাজারেও দাম বেড়েছে। গত ৩০ জুন নগদ প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২৪ টাকা ৫০ পয়সা। মঙ্গলবার তা বেড়ে ১২৬ টাকায় পৌঁছায়। অন্যদিকে খোলাবাজারে ডলারের দাম ১২৮ টাকার কাছাকাছি চলে যায়।
ডলারের এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল, সার, শিল্পের কাঁচামাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে আগের তুলনায় বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এর প্রভাব উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং খাদ্যপণ্যের দামের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টাকার মান দুর্বল হলে আমদানিকারকদের বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই বাড়তি খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়ে।
দেশের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির তথ্যেও ডলারের ওপর চাপের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে আমদানি বিল পরিশোধ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১২ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে জ্বালানি খাতে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির ব্যয়েও।
তথ্য অনুযায়ী, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ঋণপত্রের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৬৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে গ্যাসসহ অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানির ঋণপত্রের পরিমাণ ১ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানি আমদানির এই বাড়তি ব্যয় একদিকে ডলারের চাহিদা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে ডলার সরবরাহ করতে হচ্ছে, যা রিজার্ভ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
এর আগে ২০২৩ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছিল। টাকার বিনিময়হার স্থিতিশীল রাখতে টানা তিন বছর ডলার বিক্রির ফলে ওই সময় রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
তবে ২০২৪ সালের আগস্টের শুরুতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও রিজার্ভ পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে উন্নতি দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার কেনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহের কারণে রিজার্ভের অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হয়।
কিন্তু সাম্প্রতিক আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতের অতিরিক্ত চাহিদা এবং ডলারের বিনিময়হার নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের কারণে রিজার্ভ আবারও কমতে শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে পাঁচ মাস পর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসা দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন। আগামী দিনে আমদানি ব্যয়, প্রবাসী আয়, রপ্তানি আয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের গতিপ্রকৃতির ওপর রিজার্ভের অবস্থান অনেকাংশে নির্ভর করবে। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময়হার কতটা স্থিতিশীল রাখা যায়, সেটিও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

