শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনের আগে প্রকাশিত ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এমন সব দেশে বসবাস করছেন, যেগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবের মুখে রয়েছে। এসব দেশের উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের কথা উল্লেখ করেছে জাতিসংঘের সংস্থাটি।
তবে এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে মোট বাস্তুচ্যুত মানুষের তিন-চতুর্থাংশ শুধু বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানে রয়েছেন। বরং দেশ দুটির মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের বসবাসের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
জাতিসংঘের মতে, যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে ঘরবাড়ি হারানো মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও বেশি সংকটে পড়ছেন। অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে অন্য এলাকায় চলে গেলেও সেখানে বন্যা, খরা কিংবা পানির সংকটের মতো নতুন বিপদের মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে বাস্তুচ্যুতি ও জলবায়ু পরিবর্তন এখন পরস্পর সম্পর্কিত দুটি বড় মানবিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
ইউএনএইচসিআরের সহকারী হাইকমিশনার আন্তন লেইস গার্সিয়া বলেছেন, বাস্তুচ্যুত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার জন্য পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যেসব মানুষের সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের কাছে জলবায়ু অর্থায়ন পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ বোঝাতে সুদানের এক শরণার্থীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৩ সালের জুনে সুদানের আল-ফাশির এলাকায় যুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে পূর্ব চাদের ফারচানা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন।
কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানোর পরও তার দুর্ভোগ শেষ হয়নি। প্রচণ্ড গরমে আশপাশের নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়। কখনো কখনো প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত নিরাপদ পানীয় জল পান করতে পারেননি তিনি। পানির সন্ধানে তাকে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জাতিসংঘ জানিয়েছে, যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা মানুষের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন নতুন ধরনের মানবিক সংকট সৃষ্টি করছে। নিরাপদ আশ্রয় পেলেও খাদ্য, পানি ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজ দেশে স্থায়ীভাবে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ভাগে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এমন সব দেশে ফিরেছেন, যেগুলো নিজেরাই গুরুতর জলবায়ু ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
ফলে সংঘাত শেষে নিজ এলাকায় ফিরে গেলেও অনেক মানুষ আবার নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। কোথাও পানির সংকট, কোথাও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আবার কোথাও আকস্মিক বন্যা মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে।
এর একটি বড় উদাহরণ সিরিয়া। দেশটিতে সম্প্রতি প্রায় ৪০ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ ফিরে এসেছেন। কিন্তু দীর্ঘ সংঘাতের পর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করা এসব মানুষের সামনে নতুন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র পানিসংকট ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত।
এ ছাড়া গত মে মাসে ইউফ্রেটিস নদীতে বন্যা দেখা দিলে অনেক মানুষের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে হাজারো মানুষ আবারও নিজেদের বাসস্থান ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জলবায়ুজনিত বিপর্যয় মানুষের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে অবকাঠামো ও জরুরি সেবাব্যবস্থা দুর্বল থাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে এল নিনোর প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছে ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটির আশঙ্কা, এই জলবায়ুগত পরিস্থিতির কারণে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া বিভিন্ন দেশে নতুন করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষদিকে সোমালিয়া, কেনিয়া, দক্ষিণ সুদান ও উগান্ডায় সম্ভাব্য বন্যার কারণে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন।
এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে ইতোমধ্যে মানবিক সংকটে থাকা অঞ্চলগুলোতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের চাহিদা আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি নতুন বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবকেও বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের মোট জলবায়ু তহবিলের মাত্র ১০ শতাংশ সংঘাতপূর্ণ ও বিপদগ্রস্ত দেশগুলোতে পৌঁছায়।
অথচ এসব দেশের জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। অনেক দেশে যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো এবং জরুরি সেবাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশ এবং আন্তর্জাতিক অর্থদাতা সংস্থাগুলোর প্রতি সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর। বিশেষ করে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য বরাদ্দ অর্থ যেন বাস্তুচ্যুত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্যও এই সতর্কবার্তা গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো সমস্যা মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে দেশে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও জলবায়ু পরিবর্তন বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় বারবার উঠে আসছে, শুধু দুর্যোগের পর জরুরি সহায়তা দেওয়াই যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, টেকসই জীবিকা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগও প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদন বিশ্ববাসীর সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরেছে। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের সংকট। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো না গেলে আগামী দিনে আরও বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

