কক্সবাজারের টেকনাফের পাহাড়ে মানবপাচারকারীদের আস্তানায় আবারও অভিযান চালিয়েছে যৌথবাহিনী। আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৭টায় উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা-নয়াপাড়া পাহাড়ি এলাকায় অভিযান শুরু হয়। প্রায় তিন ঘণ্টার এ অভিযানে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। সেনাবাহিনীর ১০ পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্বে অভিযানে অংশ নেন সেনাবাহিনী, বিজিবি, এসআরবি ও পুলিশের শতাধিক সদস্য।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে একই পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে একটি বন্দিশালা থেকে ৫৬ জনকে উদ্ধার করে যৌথবাহিনী। ওই সময় মানবপাচার চক্রের পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়। অভিযান চলাকালে পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথবাহিনীর সদস্যদের গোলাগুলি হয়। পাচারকারীদের গুলিতে সৈনিক মোহাম্মদ তিতাস শেখ (২৭) নিহত হন। শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ফরিদপুরের নগরকান্দায় তাঁর নিজ গ্রামে দাফন করা হয়।
শুক্রবার টেকনাফ মডেল থানার প্রাঙ্গণে উদ্ধার হওয়া ৫৬ জনকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছয়জন রোহিঙ্গা এবং ৫০ জন বাংলাদেশি নাগরিক।
পাহাড়ে একাধিক মরদেহ পড়ে থাকার খবর প্রকাশের পর ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। থানায় উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম জানান, দুই পক্ষের গোলাগুলিতে একাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তবে তাঁরা ডাকাত দলের সদস্য, নাকি বন্দিশালা থেকে পালিয়ে যাওয়া ভুক্তভোগী, তা তিনি নিশ্চিত নন। বন্দিশালার কাছেই তিনটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
উদ্ধার হওয়া কয়েকজনের বক্তব্যে পাচারকারী চক্রের প্রতারণা ও বন্দিদশার চিত্রও উঠে এসেছে। ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান জানান, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে কক্সবাজারে ডেকে নেওয়া হয়। পরে পাহাড়ের একটি আস্তানায় আটকে রাখা হয়। সেখানে আট দিন তিনি বন্দি ছিলেন। দুইবার পালানোর চেষ্টা করেও সফল হননি।
তিনি বলেন, বন্দিশালায় ৫০ জনের বেশি মানুষ ছিলেন। তাঁদের সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল। সশস্ত্র লোকজন আস্তানাটি পাহারা দিতেন। বন্দিদের মোবাইল ফোনসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
পাহাড়ে একের পর এক অভিযান, গোলাগুলি ও সেনাসদস্য নিহতের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ঘেঁষা লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। ক্যাম্পটির একটি বড় অংশ পাহাড়ের পাশে অবস্থিত। সেখানে প্রায় তিন থেকে চার হাজার রোহিঙ্গার বসতি রয়েছে। গত কয়েক দিনের অভিযান ও গোলাগুলিতে বাসিন্দারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি নবী হোসেন বলেন, পাহাড়ঘেঁষা ক্যাম্পের পাশে প্রায় চার হাজার মানুষের বসতি। ঘটনার পর থেকে ক্যাম্পের লোকজন ভয়ের মধ্যে আছেন। গত কয়েক দিন ধরেই পাহাড়ে যৌথবাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।
ক্যাম্পের বাসিন্দা মরিয়ম খাতুন (৫০) বলেন, সকাল থেকে পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চলাচল বেড়েছে। এর আগে কয়েক দিন পাহাড় থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছিল।
টেকনাফ পরিদর্শনকালে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান বলেন, যত দিন সাগরপথে মানবপাচার চলবে, তত দিন অভিযান চলবে। পাহাড়ে মরদেহ থাকার খবর তাঁরা শুনেছেন। তবে উদ্ধার না করা পর্যন্ত সেখানে মরদেহ আছে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে টেকনাফের পাহাড় এখন মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর টানা অভিযানের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বন্দিশালা থেকে মানুষ উদ্ধার ও পাচারকারী আটকের মধ্য দিয়ে অভিযানে সাফল্য এলেও একজন সেনাসদস্যের মৃত্যু এবং একাধিক মরদেহের তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরছে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এবং পুরো চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

