রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা আফনান দীর্ঘদিন ধরে কিডনির জটিলতায় ভুগছেন। বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে চলতি মাসের শুরুর দিকে তিনি দেশের একমাত্র বিশেষায়িত কিডনি হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে (এনআইকেডিইউ) যান চিকিৎসা নিতে। কিন্তু হাসপাতালটির সেবার মান নিয়ে তার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। আফনান জানান, চিকিৎসক যে সাতটি ওষুধ দিয়েছেন, তার মধ্যে মাত্র দুটি ওষুধ তিনি হাসপাতাল থেকে পেয়েছেন। অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের জন্য সিরিঞ্জসহ বিভিন্ন ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও কিছুই পাওয়া যায়নি বরং বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছে।
এনআইকেডিইউতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের জন্যও একই পরিস্থিতি। ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটের কারণে বেশিরভাগ রোগীকেই বাইরের ফার্মেসিতে যেতে হয়। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১০২ ধরনের ওষুধ সরবরাহের কথা ঘোষণা করেছে, সেখানে বর্তমানে মাত্র ২০-২৫টি ওষুধই পাওয়া যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, বরাদ্দ না থাকার কারণে তারা প্রয়োজনীয়সংখ্যক ওষুধ সরবরাহ করতে পারছে না। এখন রোগীদের প্রাপ্য ওষুধের মাত্র ৩ শতাংশ হাসপাতালে সরবরাহ করা হচ্ছে। বাকি ৯৭ শতাংশ বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনতে হচ্ছে।
এনআইকেডিইউর ওষুধের চাহিদার পরিমাণ চলতি অর্থবছরে ৩৮ কোটি টাকা কিন্তু এখন পর্যন্ত ১ কোটি ২৫ লাখ টাকার ওষুধ কেনা সম্ভব হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলো সাধারণত এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে এবং টেন্ডারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনে। চলতি অর্থবছরে এনআইকেডিইউ ইডিসিএল থেকে ১৩ কোটি টাকার ওষুধ চেয়েছিল কিন্তু মাত্র ৬৩ লাখ ২২ হাজার টাকার ওষুধ পেয়েছে। একইভাবে, টেন্ডারের মাধ্যমে ২৫ কোটি টাকার ওষুধ চাওয়া হয়েছিল। তবে মাত্র ৬২ লাখ ৩৩ হাজার টাকার ওষুধ কেনা সম্ভব হয়েছে।
এনআইকেডিইউ দেশের বৃহত্তম কিডনি হাসপাতাল, প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসে এবং ৫০০ শয্যার ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেয়। এখানে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য আসা রোগীদেরকে ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করার কথা, তবে বাস্তবতা ভিন্ন। হাসপাতালের প্রবেশদ্বারে একটি সাইনবোর্ডে ১০২ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহের কথা লেখা হলেও, চিকিৎসকরা রোগীদের শুধুমাত্র কিছু ওষুধ প্রদান করতে পারছেন।
সম্প্রতি সিয়াম নামের এক বৃদ্ধ রোগী জানান, চিকিৎসক তাকে পাঁচটি ওষুধ দিয়েছেন কিন্তু হাসপাতাল থেকে মাত্র একটি সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি বলেন, “অনেক অপেক্ষার পর ডাক্তার দেখাতে পেরেছি। এখন যে একটি ওষুধ পেয়েছি, এটাই তো অনেক বেশি। যদিও নিয়ম অনুযায়ী সব ওষুধই হাসপাতাল থেকে দেয়ার কথা ছিল।”
এছাড়া আফরিন আক্তার নামে এক রোগী তার মায়ের কিডনি পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে এসেছিলেন। তবে তাকে বলা হয় যে, সিরিঞ্জ পাওয়া যাচ্ছে না এবং বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে এবং অনেক রোগীর স্বজনরাও একই অভিযোগ করেছেন।
হাসপাতালটির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “ওষুধ কেনার জন্য বরাদ্দ খুবই কম। গত ১০ অর্থবছর ধরেই এই অবস্থা চলছে। প্রতিবছরই প্রয়োজনীয় ওষুধের তালিকা দেয়া হয় কিন্তু বরাদ্দ বাড়ানো হয় না। ফলে চাহিদার ৯৭ শতাংশ ওষুধই কেনা সম্ভব হয় না।”
এনআইকেডিইউর পরীক্ষা-নিরীক্ষা সেবা নিয়েও রোগীরা অসন্তুষ্ট। বিশেষ করে আল্ট্রা কিউবি টেস্টের জন্য রোগীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। প্রতিদিন ৫০টির বেশি আল্ট্রা করা সম্ভব না হওয়ার কারণে অসংখ্য রোগীকে ফিরে যেতে হয়।
হাসপাতালটির উপপরিচালক আবু আহমদ আল মামুন এই সংকটগুলো স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “এটা ঠিক যে, আমরা খুব অল্প পরিমাণে ওষুধ সরবরাহ করতে পারি। তবে সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ শুরু করেছি। চলতি মাসের মধ্যে টেন্ডারের মাধ্যমে আরও ওষুধ সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়ে যাব।”
এছাড়া, আল্ট্রা পরীক্ষার ক্ষেত্রে রোগীদের হয়রানির বিষয়টিও তিনি মেনে নিয়ে বলেন, “আমরা প্রতিদিন ৫০টি আল্ট্রা পরীক্ষা করি। তবে যদি এটি ১২০-১৩০টি করতে পারতাম, তাহলে রোগীদের জন্য স্বস্তি হতো। আমরা এর সমাধানের জন্য কাজ করে যাচ্ছি।”

