বাংলাদেশে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পেশাকে ধরা হয় সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং পেশাগুলোর একটি। নিরীক্ষা, করনীতি এবং ব্যবসায়িক পরামর্শে সিএদের ভূমিকা অপরিসীম। তাদের কাজ শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো অর্থনীতির স্বচ্ছতা ও শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক।
অনেকে মনে করেন সিএরা কেবল নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। বাস্তবে বহুজাতিক কোম্পানি, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, খুচরা ব্যবসা ও বিভিন্ন করপোরেট সংস্থা সিএদের ওপর নির্ভর করে আর্থিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে চালাতে কিন্তু চাহিদা বাড়লেও দেশে যোগ্য সিএর সংখ্যা এখনো অনেক কম।
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) জানায়, দেশের অর্থনীতির চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন ১০ থেকে ১২ হাজার পেশাদার। অথচ মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ১,৯৬৭ জন সিএ যোগ্যতা অর্জন করেছেন। যদিও এ পেশায় আসতে নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনার বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও শিক্ষার্থীরা নানা কারণে এই পথে এগোতে দ্বিধা করেন।
বর্তমানে তিনটি জনপ্রিয় পথে সিএ হওয়া যায়। কেউ কেউ এইচএসসি বা এ লেভেলের পর সরাসরি কোনো নিবন্ধিত সিএ ফার্মে ভর্তি হন। যেমন আহমেদ জাবির, যিনি এ লেভেলের পরই আইসিএবিতে ভর্তি হয়ে অল্প বয়সেই সিএ হয়েছেন। তার মতে, বি-বা বা এমবিএ করার পরও ভালো চাকরি পাওয়া কঠিন, অথচ সিএ হিসেবে শুরুতেই ছয় অঙ্কের বেতন পাওয়া সম্ভব।
ফেলো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (এফসিএ) আনোয়ার হোসেন জানান, পেশাটির আর্থিক সুফল ও মর্যাদা এখন সুপরিচিত। আইসিএবি নিয়মিত প্রশিক্ষণ আয়োজন করে এবং উন্নত দেশের সিএ ও সিপিএ সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। ফলে বাংলাদেশি সিএরা বিদেশেও কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।
এইচএসসি শেষে ন্যূনতম জিপিএ ৮ (এসএসসি ও এইচএসসি মিলিয়ে) বা সমমানের ফলাফলে শিক্ষার্থীরা আইসিএবিতে ভর্তি হতে পারেন। এরপর নিবন্ধিত কোনো ফার্মে চার বছরের আর্টিকেলশিপ শুরু হয়। এই সময়ে বাস্তব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিন ধাপে পরীক্ষা দিতে হয়—সার্টিফিকেট, প্রফেশনাল ও অ্যাডভান্সড লেভেল। তবে সরাসরি অফিস জীবনে প্রবেশ করায় অনেকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হন।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে আইসিএবি প্রি-আর্টিকেলড স্টুডেন্ট (পিএএস) প্রোগ্রাম চালু করে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই সার্টিফিকেট লেভেলের পড়াশোনা ও পরীক্ষা দিতে পারেন। পরবর্তীতে ফার্মে যোগ দিলে এসব পরীক্ষা স্বীকৃত হয়। তবে অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাস আর সিএ পরীক্ষার মধ্যে সমন্বয় করা কঠিন। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাধারণত পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তনে নমনীয় নয়। এতে অনেকেই নিরুৎসাহিত হন। অন্যদিকে, কেউ কেউ স্নাতক শেষে সিএ করেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন উপভোগ করা গেলেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় আর্টিকেলশিপ ভাতা।
আইসিএবির নির্ধারিত ভাতা প্রথম বর্ষে মাত্র ৭ হাজার টাকা। ঢাকায় টিকে থাকার খরচ বিবেচনায় এটি একেবারেই অপ্রতুল। পরীক্ষাও কঠিন, ফলে অনেকেই একাধিকবার চেষ্টা করতে বাধ্য হন। এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থী পথ হারিয়ে ফেলেন। আনোয়ার হোসেন বলেন, ভাতা কম হলেও এটি ন্যূনতম হার। অনেক ফার্ম মেধাবী শিক্ষার্থীদের বেশি ভাতা দেয়, এমনকি রেজিস্ট্রেশন ও পরীক্ষার খরচও বহন করে। পাশাপাশি আইসিএবি আর্থিকভাবে অস্বচ্ছলদের জন্য সুদবিহীন ঋণ দিয়ে থাকে। তবে ভাতা বাড়াতে চাইলে নিরীক্ষা ফি বাড়াতে হবে, যা ব্যবসায়ীরা এড়িয়ে যেতে চাইতে পারেন। এতে স্বচ্ছতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। বাংলাদেশে নারী সিএর সংখ্যা অত্যন্ত কম। ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে মোট নারী সিএ মাত্র ১৫৯ জন।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) সাবাহ আলম বলেন, নারীরা পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক চাপের মুখোমুখি হন। অনেককে স্নাতক শেষের পরই বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়। এতে দীর্ঘ সময়ের মানসিক শ্রমসাপেক্ষ পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, কাজের পরিবেশও অনেক সময় কষ্টকর হয়ে ওঠে। আর্টিকেলশিপে থাকা শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় কাজ করেন, ভাতা কম পান, এমনকি দেরি করে এলে পুরো দিনের ভাতা কেটে নেওয়া হয়। এতে অনেকের কাছে পরিবেশ শোষণমূলক মনে হয়।
সব কষ্ট সত্ত্বেও চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পেশা দেশে এখনো সবচেয়ে লাভজনক ও মর্যাদাপূর্ণ। যোগ্য সিএর ঘাটতি পূরণে আইসিএবি ও বিভিন্ন ফার্মকে আরও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তবেই শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে এই পথে এগোতে পারবেন।

