আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক মাঠ যতটা সরব, নারী প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে চিত্রটা ততটাই বিবর্ণ। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পরিসংখ্যান বলছে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টি দলই একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন দেয়নি। এই তথ্য দেশের রাজনীতিতে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের বাস্তবতা আবারও স্পষ্ট করে তুলেছে।
দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও প্রার্থী তালিকায় তাদের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মোট ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থীর মধ্যে নারী মাত্র ১০৯ জন, যা শতাংশের হিসাবে ৪ দশমিক ২৪। এর মধ্যে ৭২ জন নারী দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন, আর বাকিরা নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে।
বড় ও ছোট—অনেক রাজনৈতিক দলই পুরোপুরি পুরুষদের দিয়ে প্রার্থী তালিকা সাজিয়েছে। এর ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে যে উদ্যোগের কথা বলা হয়, তা কতটা বাস্তব আর কতটা প্রতীকী—সেই প্রশ্নই জোরালোভাবে তুলছেন নারী অধিকারকর্মীরা। বাস্তবতা হলো, বিএনপিসহ কোনো দলই ১০ জনের বেশি নারীকে মনোনয়ন দেয়নি।
ইসি তথ্য অনুযায়ী, বড় দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ২৭৬টি মনোনয়নের একটিতেও কোনো নারী প্রার্থী নেই, যদিও দলটির নেতারা প্রকাশ্যে দাবি করেন, তাদের নেতৃত্বের অন্তত ৪০ শতাংশ নারী। একই চিত্র ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও—তাদের ২৬৮টি মনোনয়নেও নারী অনুপস্থিত।
এ তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (৯৪), খেলাফত মজলিস (৬৮) এবং বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট (বিআইএফ) (২৭)। এসব দলও কেবল পুরুষ প্রার্থীকেই মনোনয়ন দিয়েছে। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ২৪ জন, জনতার দল ২৩, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট ২০ এবং বাংলাদেশ কংগ্রেস ১৮ জন প্রার্থী দিলেও তাদের তালিকায় কোনো নারী নেই।
জাতীয় পার্টি (জেপি) (১৩), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন (১১), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট (৯) ও বাংলাদেশ জাসদ (৯) সম্পূর্ণভাবে নারীদের বাদ রেখেছে। একই অবস্থা জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (৮), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন–বিএনএম (৮), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ–বিএমএল (৭), জাকের পার্টি (৭), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি (৬) এবং গণফ্রন্টের (৬)। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (সিরাজুল) ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের পাঁচটি করে মনোনয়নেও কোনো নারী নেই।
এমনকি জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি–জাগপা, ইসলামী ঐক্য জোট, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি–বিজেপি (পার্থ) ও বাংলাদেশ উন্নয়ন পার্টির মনোনয়ন তালিকাও নারীশূন্য। তালিকার নিচের দিকে থাকা গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ ও বাংলাদেশ সমাধিকার পার্টি প্রত্যেকে মাত্র একজন করে প্রার্থী দিয়েছে, যাদের কেউই নারী নন।
এই পরিস্থিতিকে নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী স্পষ্ট ভাষায় ‘পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির ফল’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়াই নারীবান্ধব নয়। বড় দলগুলো অল্প কয়েকজন নারীকে মনোনয়ন দেয়, আর ছোট দলগুলো সেই প্রবণতাই অনুসরণ করে।
জেসমিন টুলী আরও বলেন, আর্থিক সংকট, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তথাকথিত পেশিশক্তির অভাব নারীদের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ থেকে দূরে রাখে। যারা সামনে আসেন, তাদের বড় অংশই রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। তৃণমূল থেকে উঠে আসা নারীর সংখ্যা এখনো খুবই কম। আন্দোলনের সময় নারীরা সামনে থাকলেও নির্বাচনের সময় তাদের প্রায়ই আড়ালে সরিয়ে দেওয়া হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে যেসব ২১টি দল নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, সেখানেও সংখ্যা খুব সীমিত। জাতীয় পার্টি (জি এম কাদের) ও সদ্য নিবন্ধিত বাসদ (মার্ক্সবাদী) সর্বোচ্চ ৯ জন করে নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে একজন নারীর নেতৃত্বে থাকা বিএনপি ৩০০ আসনের জন্য ৩২৮ জন আগ্রহী প্রার্থীর মধ্য থেকে মাত্র ১০ জন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
জাসদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ ও এবি পার্টিসহ কয়েকটি দল তিন থেকে ছয়জন নারী প্রার্থী দিয়েছে। এমনকি নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া দলগুলোর ক্ষেত্রেও চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের নেতাদের গড়া এনসিপি তাদের ৪৪ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র তিনজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, দলীয় কমিটিসহ কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেশিরভাগ দলই তা মানছে না। ২০২১ সালে নির্বাচন কমিশন এই শর্ত পূরণের সময়সীমা বাড়িয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করে।
ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের সভাপতি মুনিরা খান এই পরিস্থিতিকে ‘ভীষণ হতাশাজনক’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, দেশের অর্থনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতি প্রায় অনুপস্থিত। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন হক বলেন, এই চিত্র তাকে হতাশ করলেও অবাক করেনি। তাঁর মতে, এটি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। এ কারণেই কমিশন ৫০–৫০ প্রতিনিধিত্বের একটি নতুন মডেল প্রস্তাব করেছে। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি আসনে একটি সাধারণ আসনের পাশাপাশি নারীদের জন্য একটি সংরক্ষিত আসন থাকবে। এতে সংসদের সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৬০০-তে এবং সংরক্ষিত আসনগুলোতে নারীরা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নারীদের বিপক্ষেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

