রাজধানী ঢাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে চলমান গ্যাস সংকট। সিএনজি পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নগরীর গণপরিবহন ব্যবস্থায়। গ্যাসে চালিত বাস, সিএনজি অটোরিকশা এবং রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় প্রতিদিনের যাতায়াতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
পরিবহন সংকটের সুযোগে বেড়ে গেছে অটোরিকশা ও অ্যাপভিত্তিক গাড়ির ভাড়া। অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে বিকল্প হিসেবে মেট্রোরেলের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে সেখানেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় যাত্রীর চাপ অনেক বেড়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা, বনশ্রী, মিরপুর, বিমানবন্দর সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে গণপরিবহনের এমন চিত্র দেখা গেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসগুলোর একটি বড় অংশ গ্যাসচালিত। কিন্তু সিএনজি পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং পর্যাপ্ত চাপ না পাওয়ার কারণে অনেক বাস সময়মতো রাস্তায় নামতে পারছে না।
রামপুরা সেতু সংলগ্ন বনশ্রী-ডেমরা সড়কে সকালে দেখা যায়, গন্তব্যে যাওয়ার জন্য যাত্রীরা দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করছেন। অছিম, আলিফ, স্বাধীন ও আসমানী পরিবহনের কর্মীরা জানান, ডিজেলচালিত বাসগুলো চললেও গ্যাসচালিত বাসগুলো নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছে না।
তাদের ভাষ্য, অনেক চালককে সারারাত পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। কিন্তু সকাল পর্যন্ত পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় একটি ট্রিপ দেওয়ার পর আবার গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
অছিম পরিবহনের লাইন চেকার আব্বাস উদ্দিন জানান, তাদের রুটে থাকা ৫০টির বেশি বাসের প্রায় অর্ধেক গ্যাসে চলে। কিন্তু পাম্পে গ্যাসের চাপ কম থাকায় এসব বাসের বড় অংশই এখন অলস বসে থাকছে।
একই পরিস্থিতি দেখা গেছে গুলশান-মিরপুর, গাবতলী, সায়েদাবাদ, শাহবাগ এবং বিমানবন্দর রুটেও। বাসের সংখ্যা কমে যাওয়ায় চলমান বাসগুলোতে যাত্রীদের অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হচ্ছে। অনেক জায়গায় বাসে উঠতে যাত্রীদের ঠেলাঠেলি ও দীর্ঘ অপেক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন সিএনজি অটোরিকশা চালকরা। পাম্পে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় তারা দিনের বেশিরভাগ সময় রাস্তায় না থেকে পাম্পের লাইনে কাটাচ্ছেন।
চালকদের অভিযোগ, ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর অনেক সময় মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এই গ্যাস দিয়ে অল্প কিছু দূর যাওয়ার পরই আবার জ্বালানি শেষ হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু গাড়ির মালিককে প্রতিদিনের জমার টাকা ঠিকই দিতে হচ্ছে। গাড়ি চলুক বা না চলুক, চালকদের প্রায় ১২০০ টাকা পর্যন্ত দৈনিক জমা পরিশোধ করতে হচ্ছে।
সিএনজি চালক কাওছার আহমেদ ও রহিম জানান, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে সামান্য গ্যাস পাওয়ার কারণে আয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গাড়ি না চললে মালিকের জমা দেওয়া এবং পরিবারের খরচ চালানো—দুটিই কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
রাজধানীতে নিবন্ধিত ১০ থেকে ১২ হাজার সিএনজি অটোরিকশার মধ্যে অর্ধেকের বেশি এখন জ্বালানি সংকটের কারণে কার্যত বন্ধ রয়েছে বলে চালকরা জানিয়েছেন।
যেসব অটোরিকশা রাস্তায় চলছে, তাদের অনেকেই অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন। বনশ্রী থেকে গুলশান-১ যাওয়ার নিয়মিত ভাড়া যেখানে প্রায় ২০০ টাকা ছিল, সেখানে এখন অনেক চালক ৩০০ টাকার নিচে যেতে চাইছেন না। একইভাবে বনশ্রী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ভাড়া বেড়ে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়েছেন রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মের চালকরাও। উবার ও পাঠাওয়ের অনেক গাড়িই গ্যাসে চলে। ফলে পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়া তাদের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই।
চালকদের মতে, তেলে গাড়ি চালিয়ে রাইড দিলে খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে লাভ থাকে না। তাই বাধ্য হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।
মেরুল বাড্ডার একটি সিএনজি স্টেশনে অপেক্ষমাণ উবার চালক সুমন মিয়া জানান, গাড়ির মালিককে প্রতি মাসে চুক্তি অনুযায়ী ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়। সেই খরচ তুলতে মাসে অন্তত ৫০ হাজার টাকার বেশি ট্রিপ দিতে হয়।
তিনি বলেন, বর্তমানে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে কয়েকটি ট্রিপ দেওয়ার পর আবার পাম্পে ফিরে আসতে হচ্ছে।
সড়কে বাস, সিএনজি এবং অ্যাপভিত্তিক গাড়ির সংকটের কারণে অনেক যাত্রী এখন মেট্রোরেলের দিকে ঝুঁকছেন। আগে যারা অটোরিকশা বা উবারে যাতায়াত করতেন, তারাও বাধ্য হয়ে মেট্রোরেল ব্যবহার করছেন।
ফলে মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতে এবং ট্রেনের ভেতরে অতিরিক্ত ভিড় দেখা যাচ্ছে।
মিরপুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, আগে অ্যাপে কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়ি পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে সিএনজি চালকরাও অনেক বেশি ভাড়া দাবি করছেন। তাই বাধ্য হয়ে মেট্রোরেল ব্যবহার করতে হচ্ছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, সিএনজি পাম্পে গ্যাস সংকট এখন সাময়িক সমস্যা না থেকে দৈনন্দিন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি কখন স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা বা তথ্য না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
তারা বলছেন, রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা, সিএনজি পাম্পে প্রয়োজনীয় চাপ নিশ্চিত করা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে জ্বালানি সরবরাহে সামান্য সমস্যাও পুরো পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পরিকল্পনা এবং বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।

