দেশে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ দমন, সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা জোরদারের লক্ষ্যে গ্রাহকপ্রতি ১০টির বেশি সিমকার্ড বাতিল করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এ সিদ্ধান্তের ফলে সারা দেশে ৮৮ লাখেরও বেশি সিমকার্ড বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি মামলাসংক্রান্ত জটিলতায় আরও এক লাখ সিম বর্তমানে স্থগিত রয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়েছে মোবাইল গ্রাহক ও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারে। গত কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে কমছে গ্রাহকের সংখ্যা। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিমের সংখ্যা পাঁচটিতে নামিয়ে আনা হলে টেলিযোগাযোগ খাতে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
বিটিআরসি সূত্র জানায়, দেশে বাড়তে থাকা সাইবার অপরাধ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে গ্রাহকের হাতে থাকা সিমকার্ডের সংখ্যা সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় গত নভেম্বর থেকে গ্রাহকপ্রতি ১০টির বেশি সিম বন্ধ করা হয়। পরে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সিমের সর্বোচ্চ সংখ্যা পাঁচটিতে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেয় মন্ত্রণালয়।
তবে গ্রাহকদের অসন্তোষ ও আন্দোলনের মুখে এই সিদ্ধান্ত এখনই কার্যকর করা হচ্ছে না। বিটিআরসি জানিয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর সিম সংখ্যা পাঁচটিতে নামিয়ে আনার কার্যক্রম শুরু হবে।
বিটিআরসির সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিসেস বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, গ্রাহকপ্রতি ১০টি সিমে নামিয়ে আনার নির্দেশনার ফলে প্রায় ৮৯ লাখ অতিরিক্ত সিম শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ৮৮ লাখের বেশি ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে। বাকি এক লাখ সিম ভিআইপিসহ বিভিন্ন মামলা চলমান থাকায় আপাতত স্থগিত রয়েছে। তবে সেগুলোর কার্যক্রমও দ্রুত বন্ধ হবে। তিনি আরও জানান, সামনে নির্বাচন থাকায় এবং ৬ থেকে ১০টি সিম ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় আপাতত পাঁচটিতে নামিয়ে আনা হচ্ছে না। নির্বাচন শেষে এ বিষয়ে কাজ করা হবে।
সিম বন্ধ ও ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর প্রভাবে মোবাইল গ্রাহক ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমেছে। বিগত ছয় মাসে দেশে প্রায় ১৮ লাখের বেশি মোবাইল গ্রাহক কমেছে। একই সময়ে কমেছে ৬২ দশমিক ৬ লাখ মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক।
বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে দেশে চারটি সিম অপারেটরের মোট মোবাইল গ্রাহক ছিল ১৯ কোটি ৪২ লাখ। এক বছর পর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮ কোটি ৮৭ লাখে। বর্তমানে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তা কমে হয়েছে ১৮ কোটি ৭০ লাখ। গত ছয় মাস ধরেই গ্রাহক সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে।
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমলেও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গ্রাহক বাড়ছে। বর্তমানে দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করছে ১১ কোটি ৫২ লাখ গ্রাহক। চলতি বছরের জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ১৫ লাখ। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় তা ছিল ১২ কোটি ৭৫ লাখেরও বেশি। সে সময় ইন্টারনেট বন্ধ, সরকারি বিধিনিষেধ এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কড়াকড়ির কারণে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার কমতে শুরু করে।
অন্যদিকে বর্তমানে দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১ কোটি ৪৬ লাখ। জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৩৫ লাখ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের কড়াকড়ি, সিম সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত, মোবাইল ইন্টারনেটের মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্রডব্যান্ডের সহজলভ্যতার কারণে মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা কমছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, সিমকার্ড সীমিত করা এবং ব্রডব্যান্ড ব্যবহারের বৃদ্ধি এই পরিবর্তনের প্রধান কারণ। সিমের ব্যবহার কমলে স্বাভাবিকভাবেই মোবাইল ও মোবাইল ইন্টারনেটের ব্যবহার কমে যায়। কোভিড-১৯ মহামারির সময় মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়লেও পরবর্তীতে অর্থনৈতিক চাপ ও ব্যবহারের সীমাবদ্ধতায় তা আবার কমেছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, গ্রাহকপ্রতি ১০টি সিমে নামিয়ে আনার ফলে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার কথা নয়। তবে সিম সংখ্যা পাঁচটিতে নামিয়ে আনা হলে বাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে। এতে রাজস্বসহ অন্যান্য খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

