Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice Mon, Feb 9, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » ধলেশ্বরী নদীর জীবন ট্যানারি বর্জ্যের কবলে
    বাংলাদেশ

    ধলেশ্বরী নদীর জীবন ট্যানারি বর্জ্যের কবলে

    মনিরুজ্জামানJanuary 31, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    ঢাকার প্রাণরেখা বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার আশায় ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প সরিয়ে নেওয়া হয় সাভারে। লক্ষ্য ছিল নদী রক্ষা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং চামড়া শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করা। তবে প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বুড়িগঙ্গার দূষণ কমেনি, বরং নতুন করে দূষণের বোঝা বইছে ধলেশ্বরী নদী।

    সাভারের চামড়া শিল্পনগরী ঘেঁষে বয়ে চলা ধলেশ্বরী আজ দূষণের চাপে বিপর্যস্ত। নদীর পাড়ে জমছে বর্জ্য। পানিতে ভাসছে চামড়ার টুকরো। মাছ কমে গেছে। স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবন থেকে নদী যেন হারিয়ে যাচ্ছে।

    এক বিকেলে ধলেশ্বরীর তীরে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ছোটবেলায় এই নদীতেই গোসল করতেন তারা। এখন নদীতে নামা তো দূরের কথা, পাড়েও কেউ আসে না। মাছ খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ভেঙে গেছে।

    এই ক্ষোভ শুধু স্থানীয়দের নয়। পরিবেশকর্মী, ট্যানারি মালিক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কণ্ঠেও রয়েছে হতাশার সুর। পরিবেশকর্মীরা বলছেন, যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় ট্যানারি শিল্প পানি, মাটি ও বাতাস—তিন ক্ষেত্রেই মারাত্মক দূষণ সৃষ্টি করছে। পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় মাছসহ জলজ প্রাণ কমছে। এর প্রভাব পড়ছে পুরো জীববৈচিত্র্যের ওপর। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এই দূষণের বাস্তবতা অস্বীকার করছে না।

    হাজারীবাগের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বুড়িগঙ্গার দূষণ রোধের পাশাপাশি চামড়া শিল্পের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ২০০৩ সালে ‘বিসিক চামড়া শিল্পনগরী, ঢাকা’ প্রকল্প গ্রহণ করে। সাভারের হেমায়েতপুরের হরিণধরায় ধলেশ্বরী নদীর তীরে প্রায় ২০০ একর জমিতে গড়ে ওঠে এই শিল্পনগরী। ২০১৭ সালে হাজারীবাগের ট্যানারিগুলো সেখানে স্থানান্তর করা হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে ২০২১ সালে ১৬২টি ট্যানারিকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।

    চামড়া শিল্প যে বিশ্বের অন্যতম দূষণকারী শিল্প—এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই শিল্পনগরীতে ১৭ একর জমিতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি স্থাপন করা হয়। কিন্তু শুরু থেকেই এই সিইটিপি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত চীনা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী কাজ করেনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী যে সক্ষমতা থাকার কথা, আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থাই বাস্তবে তা পায়নি।

    এখনো সিইটিপি তরল ও কঠিন বর্জ্য শোধনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত সব মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। শতভাগ কার্যকর হতে না পারাই সাভার চামড়া শিল্পনগরীর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

    সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে সাভার শিল্পনগরীতে ১৪৭ থেকে ১৪৮টি ট্যানারি সচল রয়েছে। অথচ সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর নয়। কয়েকটি সূচকে এখনো পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে এটি। ছয়টি ট্যানারিকে নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হলেও বাস্তবে ইটিপি চালু করেছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান।

    আরও বড় সংকট তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ঘিরে। সাভারে লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাওয়া ট্যানারি মাত্র একটি। সারা দেশে এই সনদপ্রাপ্ত ট্যানারির সংখ্যা আটটি। কঠিন বর্জ্য কমাতে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে কাঁচা চামড়ার কাটিং রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হলেও, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এলডব্লিউজি সনদের অভাবে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।

    বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে নেওয়া উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ধলেশ্বরীকেই বিপদের মুখে ফেলেছে—এমন বাস্তবতায় এখন প্রশ্ন উঠছে, পরিবেশ রক্ষা ও শিল্প উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকছে কি না।

    অনুসন্ধানে দেখা গেল বাস্তবতা:

    সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপির পাশেই ধলেশ্বরী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে ওপেন ডাম্পিং ইয়ার্ড। এই ডাম্পিং ইয়ার্ডে সিইটিপি থেকে পরিশোধিত কঠিন বর্জ্য ফেলা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ট্যানারি থেকেও ট্রাকে করে এনে এখানে কঠিন বর্জ্য জমা করা হচ্ছে। কিন্তু যেসব স্থানে এই বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, সেগুলো পুরোপুরি উন্মুক্ত।

    ডাম্পিং ইয়ার্ড শুধু খোলা জায়গা নয়, নদীর ধার ঘেঁষে থাকা দুটি পুকুরাকৃতির ডাম্পিং স্থানে নেই কোনো সুরক্ষাবেষ্টনী বা দেওয়াল। ফলে বৃষ্টির দিনে এসব স্থানের বর্জ্য সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে পড়ে। শুষ্ক মৌসুমেও বর্জ্যের সঙ্গে থাকা তরল অংশ নদীতে গড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে।

    এখানেই শেষ নয়। উন্মুক্ত ওই স্থানেই পোড়ানো হচ্ছে চামড়া শিল্পের কঠিন বর্জ্য। এতে চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র দুর্গন্ধ। পরিবেশ ও নদী দূষণের এই বাস্তবতা অস্বীকার করছে না খোদ প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনও (বিসিক)। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিসিকের এক কর্মকর্তা  বলেন, প্রকল্প নকশায় ডাম্পিং ইয়ার্ডে দেওয়াল বা শেডের ব্যবস্থা ছিল না। সে কারণেই এগুলো খোলা অবস্থায় রয়েছে। তাঁর ভাষায়, এটি প্রকল্পের একটি বড় ব্যর্থতা।

    বিসিকের চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলামও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ডাম্পিং ইয়ার্ডে দেওয়াল না থাকায় পরিবেশের কিছু ক্ষতি হচ্ছে—এটা বিসিক মানে। বৃষ্টির পানি বা বন্যার সময় বর্জ্য নদীতে চলে যাওয়া ঠেকাতে প্রয়োজনে দেওয়াল বা আবদ্ধ ব্যবস্থার কথাও ভাবা হচ্ছে।

    এদিকে, সিইটিপি থেকে যে পাইপের মাধ্যমে পরিশোধিত পানি নদীতে ফেলা হয়। নদীর তীরে নেমে দেখা যায়, পাইপের একটি অংশে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে পানি পড়ে আশপাশের মাটিতে জমছে। ওই অংশের মাটি কালচে রং ধারণ করেছে, যা ট্যানারি বর্জ্য ও পানির কারণে মাটিও যে দূষিত হচ্ছে, তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

    শিল্পনগরীর ভেতরেও একই চিত্র। ট্যানারি পল্লির একটি উন্মুক্ত ড্রেনে কালো রঙের পানি প্রবাহিত হতে দেখা গেছে। এই পানি পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। ট্যানারির অভ্যন্তরীণ পরিবেশও খুব একটা পরিষ্কার বা পরিবেশসম্মত নয়।

    এ বিষয়ে বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ট্যানারি শিল্পের কারণে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে—এ কথা বিসিকও বিশ্বাস করে। তিনি স্বীকার করেন, সিইটিপি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ডাম্পিং ইয়ার্ড থেকে যাতে বর্জ্য বৃষ্টির পানিতে গড়িয়ে বা অন্য কোনোভাবে নদীতে না যায়, সে জন্য সেখানে দেওয়াল নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। তাঁর মতে, এই শিল্পনগরীতে কঠিন বর্জ্য ও সিইটিপি ব্যবস্থাপনা আরও ভালো হতে পারত।

    পরিবেশগত মানদণ্ডে সিইটিপির বর্তমান অবস্থা:

    সাভার চামড়া শিল্পনগরীর সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা সিইটিপির ওপর নির্ভর করছে পুরো শিল্পনগরীর তরল ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ট্যানারি থেকে নির্গত ক্রোমযুক্ত পানি ও সাধারণ বর্জ্যপানি সিইটিপিতে এসে শোধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নদীতে নিঃসৃত হয়। আর কঠিন বর্জ্য রাখা হয় শিল্পনগরীর উন্মুক্ত ডাম্পিং ইয়ার্ড ও ডাম্পিং স্টেশনে। সেখান থেকেই বিভিন্ন সময়ে এসব বর্জ্য সরাসরি নদীতে চলে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে।

    পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত আগস্টে কিছু সূচকে সিইটিপির অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সূচকে গুরুতর দুর্বলতা রয়ে গেছে। ওই সময় ক্রোমিয়ামের মাত্রা ছিল ১ দশমিক ৪৫, যেখানে পরিবেশগত মানদণ্ড অনুযায়ী সর্বোচ্চ সীমা ২। অর্থাৎ এই সূচকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। একইভাবে ওয়েল অ্যান্ড গ্রিজের মাত্রা পাওয়া গেছে ৫ দশমিক ৬, যেখানে ক্ষতিকর মাত্রা ধরা হয় ১০-এর বেশি। পিএইচের মাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৪৫, যা নির্ধারিত ৭ থেকে ৯-এর সীমার মধ্যেই রয়েছে।

    তবে পানির গুণমান নির্ধারণের দুটি প্রধান সূচক—বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) এবং টোটাল সাসপেন্ডেড সলিডস (টিএসএস)—এই দুই ক্ষেত্রেই সিইটিপি মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে রয়েছে। গত আগস্টে বিওডির মাত্রা পাওয়া গেছে ৩০৮, যেখানে আদর্শ মান মাত্র ৩০। একইভাবে টিএসএসের আদর্শ মান ১০০ হলেও বাস্তবে পাওয়া গেছে ১৬২। ক্লোরাইডের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। নির্ধারিত মান ২ হাজার হলেও ওই সময় ক্লোরাইডের মাত্রা ছিল ৪ হাজার ১০০।

    এই পরিস্থিতি নিয়ে সিইটিপির দায়িত্বে থাকা ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ওয়েস্টেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ  বলেন, ট্যানারিগুলো যদি প্রিট্রিটমেন্ট, ক্রোম রিকোভারি এবং হাইকোর্টের নির্দেশিত চারটি বিধি সঠিকভাবে অনুসরণ করে, তাহলে বিওডি, টিডিএস ও টিএসএসের মান উন্নত হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পেলে সিইটিপির অচল যন্ত্রাংশ সংস্কার ও প্রযুক্তি উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। তখন সব সূচক পরিবেশগত মানদণ্ডের কাছাকাছি চলে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

    নদীর পানির রং নিয়ে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নদীর পানি পুরোপুরি কালো নয়, তবে একেবারে স্বচ্ছও নয়। সিইটিপি থেকে নিঃসৃত পানি হালকা লালচে রঙের হয়ে থাকে। এর কারণ হলো বায়োলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট প্রক্রিয়া, যেখানে অ্যামিবা, ফাঙ্গাস ও ব্যাকটেরিয়ার মতো অণুজীব বর্জ্য ভেঙে ফেলে। তাঁর ভাষায়, পুরোপুরি স্বচ্ছ পানি পেতে হলে টারশিয়ারি ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন। কিন্তু সিইটিপি নির্মাণের সময় এই ধাপটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ভবিষ্যতে উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করা গেলে সেই পানি পুনর্ব্যবহারও করা সম্ভব হবে, নদীতে ফেলতে হবে না।

    এদিকে, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছে বিসিক। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম  বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে যে সলিড ওয়েস্ট রয়েছে, তার বড় অংশই ৮ থেকে ১২ বছর ধরে জমে থাকা পুরোনো বর্জ্য। আগের অবৈজ্ঞানিক ডিসপোজাল ব্যবস্থার কারণেই এই স্তূপ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন উপায়ে এই বর্জ্য অপসারণের চেষ্টা চলছে। এরই মধ্যে ক্রোম শেভিং ডাস্ট চীনের একটি প্রসেসিং সেন্টারে পাঠানো হচ্ছে। র-ট্রিমিং, মাথা ও অন্যান্য বর্জ্যের একটি অংশ রপ্তানিও করা হচ্ছে। ফলে নতুন করে কঠিন বর্জ্য জমার হার কমে এসেছে।

    ক্রোমযুক্ত পানি নদীতে সরাসরি যাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, এমন ধারণা তৈরি হলেও বাস্তবে বিপুল পরিমাণ ক্রোমযুক্ত পানি সরাসরি নদীতে যাচ্ছে না। ক্রোম ব্যবহার হয় ট্যানারির ওয়েট স্টেজ ও ক্রাস্টিং স্টেজে। তার আগের ধাপে যে লালচে পানি বের হয়, সেটি ক্রোমযুক্ত নয়। বর্তমানে ট্যানারিগুলোর ক্রোমযুক্ত বর্জ্য সিইটিপিতে শোধনের পরই নদীতে নিঃসৃত করা হয়। তবে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ক্রোমযুক্ত পানি বাইরে ফেললে সেটি অপরাধ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

    স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের বক্তব্য:

    সাভারের চামড়া শিল্পনগরী ঘিরে পরিবেশ বিপর্যয়ের অভিযোগ নতুন নয়। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, প্রকল্পের নকশা থেকে বাস্তবায়ন—প্রতিটি ধাপেই রয়েছে মৌলিক ত্রুটি, যার খেসারত দিচ্ছে নদী, পরিবেশ ও মানুষ।

    সাভার নদী ও পরিবেশ উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. শামসুল হক  বলেন, সাভার ট্যানারির ডাম্পিং স্টেশন উন্মুক্ত অবস্থায় রয়েছে। সেখান থেকে বর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। তাঁর অভিযোগ, ট্যানারির কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর নয় এবং এটি পরিবেশ ও নদী দূষণের অন্যতম উৎস। তাঁর ভাষায়, এই প্রকল্প শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

    শামসুল হক আরও বলেন, নদী দখল করেই ট্যানারি স্থাপন করা হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সাভারের সব সেক্টরে। তাঁর মতে, ওপেন ডাম্পিং স্টেশন ও অকার্যকর ইটিপির কারণে মাছ তো দূরের কথা, পানিও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে। পানিতে হাত দেওয়া যায় না, বাতাসও দূষিত। তিনি উল্লেখ করেন, সাভারকে ডি-গ্রেড এয়ারশেড ঘোষণা করা হয়েছে। পানি, মাটি ও বাতাস—তিন ক্ষেত্রেই ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হলেও কেউ যেন তা মানতে চাইছে না।

    একই ধরনের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন সাভার নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. সালাহ্ উদ্দিন খান (নঈম)। তিনি  বলেন, ট্যানারিতে কাঁচা চামড়া লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে রাখা হয়। শিল্পনগরীর ভেতরের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে লবণাক্ত পানি সরাসরি ধলেশ্বরীতে যাচ্ছে। সেই পানি তুরাগ হয়ে আবার বুড়িগঙ্গায় প্রবাহিত হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন রাসায়নিক, চামড়ার লোম ও প্রলেপ কৃষিজমি ও নদীতে মিশে জমি লবণাক্ত করে তুলছে।

    এর ফলে মাছ মারা যাচ্ছে, পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং কৃষিজমির উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানান তিনি। গবাদিপশু পালনের ক্ষেত্রেও সংকট দেখা দিয়েছে বলে দাবি করেন সালাহ্ উদ্দিন খান।

    তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী এসব বর্জ্য ট্যানারির ভেতরেই প্রক্রিয়াজাত করে সিইটিপিতে পাঠানোর কথা। সেখানে শোধনের পরই তা নদীতে নিঃসরণ হওয়ার কথা। কিন্তু সিইটিপি সচল না থাকায় এবং অনেক ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল ব্যবস্থার কারণে ট্যানারি শিল্পের প্রভাবে এলাকায় ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে।

    পরিবেশ আন্দোলনকারীরাও একই বাস্তবতার কথা বলছেন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির  বলেন, হাজারীবাগে ট্যানারি থাকার সময়ই বুড়িগঙ্গা প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তখন কোনো কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা ছিল না। কেমিক্যাল ও বিষাক্ত পানি সরাসরি নদীতে ফেলা হতো। ফলে মাছ, জীববৈচিত্র্য ও নদীর স্বাভাবিক জীবন সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

    তিনি বলেন, আন্দোলনের মুখে ট্যানারি সাভারে সরিয়ে নেওয়া হলেও সেখানে যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়াই কেন্দ্রীয় সিইটিপি স্থাপন করা হয়েছে। সেটি এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। ড্রেনেজ ও ডাম্পিং ব্যবস্থাও পরিবেশসম্মত নয়। তাঁর অভিযোগ, সাভারের ট্যানারি থেকে দূষিত পানি ও বর্জ্য ধলেশ্বরীসহ আশপাশের নদীগুলোকে আবারও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক জায়গায় বর্জ্য মাটির নিচ দিয়েই নদীতে মিশে যাচ্ছে, যা মাছ ও জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক হুমকি।

    এই অবস্থার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন বাপার এই নেতা। তিনি বলেন, বিষয়গুলো বারবার জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অবহেলা, অনাগ্রহ ও দুর্নীতির কারণেই পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স মানা হচ্ছে না।

    মাছ ও পানি দূষণ প্রসঙ্গে মো. আলমগীর কবির বলেন, নদীর পানিতে ক্রোমিয়ামসহ ট্যানারির বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশে গেলে মাছ বেঁচে থাকার প্রশ্নই আসে না। পানির স্বাভাবিক গুণগত মান নষ্ট হলে মাছ ধ্বংস হবেই। একই সঙ্গে খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বাতাস মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এতে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

    স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও তিনি সতর্ক করেন। তাঁর মতে, ট্যানারি এলাকায় শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। হাজারীবাগের মতোই এখন সাভার এলাকাতেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে মানুষ সেখানে বসবাস করলেও তারা প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

    বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলন কর্মী রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ট্যানারি শিল্প পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছিল বলেই একে জনবহুল এলাকা থেকে সরানো হয়েছিল। কিন্তু স্থানান্তরের পরও যদি নদীতে সরাসরি বর্জ্য নিঃসরণ হয়, তাহলে পরিমাপ ছাড়াই বলা যায়—এটি পরিবেশ দূষণ করছে এবং কোনো আইনেই তা গ্রহণযোগ্য নয়।

    কারা দায়ী—এই প্রশ্নে তিনি বলেন, দেশে আইন ও নীতির অভাব নেই, কিন্তু বাস্তবায়নে বড় দুর্বলতা রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের বড় দায়িত্ব থাকলেও শাস্তিমূলক বিধান থাকা সত্ত্বেও তা প্রয়োগ করা হয় না। তিনি আরও বলেন, কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। একেকটি দপ্তর অন্যটির দায়িত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত খোঁজ রাখে না—এটাই বড় দুর্বলতা।

    এদিকে, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাভার চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপির সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় কম। এই সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই সক্ষমতার হিসাব কারা করেছে এবং কেন তা বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে না।

    তিনি বলেন, রাতের বেলায় নদীতে বর্জ্য ফেলার ঘটনাগুলো দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো জানে এবং তারা এসব তথ্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচার করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রপ্তানিতে। নদী ধ্বংস হচ্ছে এবং শিল্প কার্যক্রম পরিবেশবান্ধব হচ্ছে না—এই বাস্তবতায় জরুরি ভিত্তিতে সিইটিপিকে আরও পরিবেশসম্মত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

    মালিকপক্ষ ও নেতাদের অভিমত:

    নদী ও পরিবেশ দূষণের অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করছেন না সাভারের ট্যানারি মালিকরা। তবে তাঁদের দাবি, দূষণের মূল কারণ ট্যানারিগুলো নয়, বরং কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপির পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর না হওয়া।

    এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বলেন, হাজারীবাগে ট্যানারি থাকার সময় কোনো ধরনের ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টই ছিল না। সাভারে স্থানান্তরের পর অন্তত তরল বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থা হয়েছে। তবে তাঁর মতে, সেই ট্রিটমেন্ট এখনো পুরোপুরি পরিবেশসম্মত নয়।

    মো. শাহীন আহমেদ বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের মানদণ্ড অনুযায়ী সিইটিপিতে প্রায় ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত বর্জ্য পরিবেশসম্মতভাবে শোধন হচ্ছে। বাকি ১৫ শতাংশ এখনো মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে সলিড ওয়েস্ট কার্যত শূন্যের কোটায় রয়েছে। কঠিন বর্জ্য ওপেন ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চীনা একটি কোম্পানি কারখানা স্থাপন করে ‘র-হাইটসের’ কাটিং সংগ্রহ করছে এবং সেগুলো ব্যবহার করছে, যা শিল্পের জন্য ইতিবাচক দিক বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, সলিড ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনায় আরও দুই-একটি কারখানা স্থাপন করা গেলে এই সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান পাওয়া সম্ভব।

    সিইটিপির দায়ভার প্রসঙ্গে বিটিএ চেয়ারম্যান বলেন, সিইটিপি স্থাপন ও পরিচালনার দায়িত্ব বিসিকের। ট্যানারি মালিকরা নিয়মিত ট্রিটমেন্টের খরচ পরিশোধ করছেন। সঠিকভাবে ট্রিটমেন্ট হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করা বিসিকের দায়িত্ব। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সিইটিপিতে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ট্রিটমেন্ট হচ্ছে।

    একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও সালমা ট্যানারির মালিক মো. সাখাওয়াত উল্লাহ। তিনি বলেন, সিইটিপি কার্যকর রয়েছে, তবে কয়েকটি প্যারামিটার পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী এখনো সঠিক মাত্রায় পৌঁছায়নি। তাঁর ভাষায়, ক্লোরাইড, বিওডি ও ক্রোমের মতো কিছু সূচকে ঘাটতি রয়েছে, যদিও অন্যান্য প্যারামিটার পরিবেশগত মানদণ্ডের মধ্যে রয়েছে।

    মো. সাখাওয়াত উল্লাহ দাবি করেন, ট্যানারি থেকে নির্গত সব পানি ট্রিটমেন্টের পরই নদীতে নিঃসৃত হয়। ট্রিটমেন্ট ছাড়া কোনো পানি সরাসরি নদীতে ফেলা হয় না। তিনি আরও বলেন, ফ্লেশিংয়ের স্লাজ এখন আর নদীর পাড়ে রাখা হয় না। এসব বর্জ্য ডাম্পিং স্থানে রাখা হচ্ছে। মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বর্জ্য নদীর ধারে রাখা হচ্ছে না এবং আগের মতো খোলামেলা স্থানে সংরক্ষণও করা হচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন।

    মালিকপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সাভার শিল্পনগরীতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আগের তুলনায় অগ্রগতি হলেও সিইটিপির সক্ষমতা ও মানদণ্ড পূরণে সীমাবদ্ধতার কারণেই পরিবেশগত সংকট পুরোপুরি কাটছে না। সূত্র: জাগো নিউজ

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    বাংলাদেশ

    ঢাকা উত্তর সিটির নতুন প্রশাসক সুরাইয়া আক্তার জাহান

    February 9, 2026
    বাংলাদেশ

    বিদায়ী বৈঠকে সচিবদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রধান উপদেষ্টার

    February 9, 2026
    বাংলাদেশ

    ভোট ঘিরে ৮২ ঘণ্টা নিজ এলাকা ছাড়ায় নিষেধাজ্ঞা

    February 9, 2026
    Leave A Reply Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইরাকে নতুন আইন নিয়ে উদ্বেগ, শাস্তির ভয় সবার মনে

    আন্তর্জাতিক August 4, 2025

    যমুনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হলেন বেলাল হোসেন

    ব্যাংক October 30, 2025

    সব ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপী নয়

    মতামত January 13, 2025

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি October 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsAppp

    01339-517418

    Copyright © 2025 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.