দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের আর্থিক স্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাত্র ২০ জন শীর্ষ ঋণখেলাপির কাছে আটকে আছে প্রায় ৯১ হাজার কোটি টাকা, যা এসব ব্যাংকের মোট শ্রেণীকৃত ঋণের অর্ধেকেরও বেশি। ফলে ঋণ আদায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, বাড়ছে মূলধন ঘাটতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক এবং বিডিবিএল—এই ছয় ব্যাংকের মোট শ্রেণীকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছেই রয়েছে ৯১ হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু ২০২৫ সালে এ বিশাল অঙ্কের বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র প্রায় ৪৬৯ কোটি টাকা, যা মোট পাওনার মাত্র ০.৫ শতাংশের সামান্য বেশি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সংকটে রয়েছে জনতা ব্যাংক। এই ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপির কাছেই আটকে আছে প্রায় ৫৮ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। অথচ গত বছর এসব খেলাপির কাছ থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ৫৫ কোটির কিছু বেশি, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। অন্যদিকে, রূপালী ব্যাংক তুলনামূলকভাবে বেশি আদায় করতে পারলেও মোট পাওনার তুলনায় তা এখনও নগণ্য। ব্যাংকটির শীর্ষ খেলাপিদের কাছে প্রায় ৮ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা পাওনা থাকলেও আদায় হয়েছে কয়েকশ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
সোনালী, অগ্রণী, বেসিক ও বিডিবিএল—সবগুলো ব্যাংকেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে থাকলেও আদায়ের হার খুবই কম। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকগুলোর মূলধনে। জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক বড় অঙ্কের মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে এই ঘাটতি হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সোনালী ব্যাংক কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে সামান্য উদ্বৃত্ত দেখাতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মূলধন ঘাটতি পূরণে বারবার সরকারি অর্থ ঢালতে হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত করদাতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
চমকপ্রদভাবে দেখা যাচ্ছে, খেলাপি ঋণের চাপ থাকা সত্ত্বেও এসব ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমানত বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও ঋণ আদায় না হলে তা দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
মাত্র ২০ জন ঋণগ্রহীতার কাছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা আটকে থাকা ব্যাংক খাতের জন্য বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করেছে। এতে ঝুঁকি ছড়িয়ে না পড়ে নির্দিষ্ট কিছু গ্রাহকের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই অর্থ পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে। অনেক দেশে এ ধরনের খেলাপিদের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়, ফলে তারা সহজে ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারেন না।
খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণে সরকারকে নিয়মিত অর্থ জোগান দিতে হচ্ছে। এতে একটি “দুষ্টচক্র” তৈরি হয়েছে—খেলাপি ঋণ বাড়ে, ব্যাংক দুর্বল হয়, তারপর করদাতার অর্থ দিয়ে তা সামাল দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে কয়েকটি বিষয়ে জোর দিতে হবে—
- শক্তিশালী আইনি কাঠামো
- দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া
- পেশাদার পরিচালনা পর্ষদ
- কঠোর জবাবদিহি
তাদের মতে, শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা অবলোপন নয়, প্রকৃত খেলাপিদের চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি। নইলে ব্যাংকিং খাতের এই সংকট আরও গভীর হতে পারে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

