ব্যাংককে সাধারণত টাকা লেনদেনের একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হলেও এর ভূমিকা তার চেয়েও অনেক বিস্তৃত। অর্থনীতির চাকা সচল রাখার পাশাপাশি ব্যাংককে জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি বা ‘ইঞ্জিন’ হিসেবে ধরা হয় কিন্তু বাস্তবতায় দেশে ব্যাংকগুলোর পরিচিতি অনেকটাই শাখা-নির্ভর কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ইট-পাথরের শাখা ঘিরেই যেন ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রধান চিত্র দাঁড়িয়ে গেছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে আর্থিক সেবার মান ও কার্যকারিতা বাড়েনি। বর্তমানে দেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা ৫২টি। তুলনামূলকভাবে বড় অর্থনীতি ও বিশাল জনসংখ্যার দেশ ভারতেই এই সংখ্যা ৩৩। বণিক বার্তার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের মাধ্যমে ভারতে অন্তত ৪০টি ব্যাংক কমিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে দেশটি যেমন করপোরেট সুশাসন জোরদার করতে পেরেছে, তেমনি খেলাপি ঋণের হারও ২ শতাংশের কাছাকাছি নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। দুই দেশের ব্যাংক সংখ্যার এই পার্থক্য শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নিয়ন্ত্রক সক্ষমতার পার্থক্যকেও স্পষ্ট করে।
গত দুই দশকে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া আজ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ প্রান্তিকে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ২১ হাজার কোটি রুপিরও বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলো বড় চাপে রয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৪৪ শতাংশেরও বেশি এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। এই সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি; বরং দীর্ঘদিনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ব্যর্থতার ফল।
অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বহু সময় রাজনৈতিক চাপের মুখে কাজ করতে হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। পুনঃতফসিল, ঋণ অবলোপন এবং বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণের চিত্র আড়াল করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এতে আর্থিক প্রতিবেদনে বাস্তব অবস্থা প্রতিফলিত হয়নি। গত দেড় দশকে ১৬টি নতুন ব্যাংক লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, যার অধিকাংশই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আপত্তি উপেক্ষা করে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদিত হয় বলে আলোচনায় এসেছে।
ছোট বাজারে অতিরিক্ত ব্যাংক প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দেয়, ফলে অনেক ব্যাংক ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ প্রদানে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণ পাচারের সংস্কৃতি গড়ে ওঠায় কিছু ব্যাংক কার্যত ‘লাইফ সাপোর্টে’ চলে যায়। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর ১৫টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার ঘটনাও এই অনিয়মের গভীরতা তুলে ধরে। সরকারি ব্যাংকগুলোতেও সঞ্চিতি ও মূলধন ঘাটতি কয়েক হাজার কোটি টাকার পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অনেক ব্যাংককে রাষ্ট্রীয় সহায়তার ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে।
এশিয়ার অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে। ১৯৯৭–৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর দক্ষিণ কোরিয়া ব্যাংক খাতে বড় ধরনের একীভূতকরণ নীতি গ্রহণ করে। এতে ছোট ও দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, ফলে ব্যাংকের সংখ্যা কমলেও মূলধনের ভিত্তি শক্তিশালী হয়। একই পথ অনুসরণ করে মালয়েশিয়া ৫৪টি ব্যাংক একীভূত করে ১০টি শক্তিশালী ‘অ্যাংকর ব্যাংক’ গড়ে তোলে। ফিলিপাইন নতুন ব্যাংক খোলার পরিবর্তে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের দিকে অগ্রসর হয় এবং সীমিত লাইসেন্স নীতির মাধ্যমে শাখা-নির্ভরতা কমিয়ে আনে।
ভারত আধার কার্ড ও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ‘ব্যাংকিং উইদাউট ব্যাংক ব্রাঞ্চেস’ ধারণাকে জনপ্রিয় করেছে। ব্রাজিলের ‘পিক্স’ সেবা এবং এনইউব্যাংকের মতো ডিজিটাল ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বিস্তৃত করেছে। ভিয়েতনাম আবার উৎপাদনশীল ও এসএমই খাতে ঋণকে অগ্রাধিকার দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, ব্যাংকের সংখ্যা নয় বরং নীতি ও কাঠামোই মূল শক্তি নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের সুযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান যাচাই বা অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ এবং ফরেনসিক অডিট করা জরুরি। প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে দুর্বল সরকারি ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কিছু ব্যাংককে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার দৃষ্টান্তও অনুসরণযোগ্য। পাশাপাশি চলমান শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূতকরণের জটিলতা আমানতকারী ও গ্রাহকদের স্বার্থে সমাধান করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা নিশ্চিত করাও সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার নেতৃত্বে পরিচালনার ওপর জোর দিতে হবে। নতুন ব্যাংক লাইসেন্স প্রদানে কঠোর মানদণ্ড আরোপ করা দরকার। একই সঙ্গে আলাদা ডিজিটাল ব্যাংকের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করা বেশি কার্যকর হতে পারে। পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, স্বাধীন পরিচালকের কার্যকর ভূমিকা এবং ঋণ অনুমোদনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে অর্থঋণ আদালতের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং দেউলিয়া আইন আধুনিকীকরণও জরুরি।
সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের সংস্কার কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং একটি সমন্বিত কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি গ্রহণই হতে পারে কার্যকর পথ। ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করা গেলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা কঠিন হয়ে পড়বে।

