ছোট দ্বীপরাষ্ট্রসহ তুলনামূলক ক্ষুদ্র অর্থনীতির দেশগুলোকে বৈশ্বিক ঝুঁকি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে আনতে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে বিশ্বব্যাংক। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নীতি সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকের সময় ৫০টি ছোট দেশের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের নিয়ে আয়োজিত একটি বৈঠকে এই কৌশল তুলে ধরেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট আজয় বাঙ্গা। সেখানে তিনি বলেন, ছোট দেশগুলোর জন্য উন্নয়ন কৌশল একরকম নয়, বরং প্রতিটি দেশের বাস্তবতার ভিত্তিতে আলাদা পদ্ধতি গ্রহণ করা হবে।
নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো ছোট অর্থনীতিগুলোতে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, ব্যবসা পরিচালনার বাধা কমানো এবং টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, সাশ্রয়ী জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, ছোট দেশগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈশ্বিক দামের ওঠানামা এবং অর্থনৈতিক সংকটে তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি ঘূর্ণিঝড়, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা পর্যটন খাতে ধস—এ ধরনের ঘটনা কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছে, ছোট রাষ্ট্রগুলোতে প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় বড় দেশের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। তাই কার্যকারিতা বাড়াতে সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করা, নমনীয় অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করা এবং প্রতিটি অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। টোঙ্গায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে একটি নগর অবকাঠামো সহনশীলতা প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যা বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকের মধ্যে প্রথম ধরনের সমঝোতা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, ক্যারিবীয় অঞ্চলে এই ধরনের যৌথ প্রকল্প সম্প্রসারণের জন্য ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে নতুন সহযোগিতা পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ছোট দেশগুলোর জন্য উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন মডেল তৈরি করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, শুধু অবকাঠামো নয়, বরং নীতি বিশ্লেষণ ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য কয়েকটি দেশে বিস্তারিত গবেষণা ও প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে, যাতে বোঝা যায় কোন খাতে কর্মসংস্থান সবচেয়ে বেশি বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের বিনিয়োগ শাখা বিভিন্ন প্রকল্পে অংশ নিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বতসোয়ানায় একটি বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়নের পাশাপাশি ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সাহায্য করবে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্য পুনরাবৃত্তিযোগ্য উন্নয়ন মডেল তৈরি করছে, যা কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সব মিলিয়ে নতুন এই কৌশল ছোট দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

