ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের বিকল্প পথ খোঁজার বৈশ্বিক প্রবণতার মধ্যে চীনের আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে চীনের স্থানীয় বন্ডবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ হিসেবে পরিচিত ‘পান্ডা বন্ড’ ইস্যুর সম্ভাবনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দলের বৈঠকে এ দুটি বিষয় গুরুত্ব পায়। বৈঠকে অংশ নেওয়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক যদি চীনের ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেমে যুক্ত হতে চায়, তাহলে নীতিগতভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আপত্তি নেই। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজ উদ্যোগে এ বিষয়ে অগ্রসর হতে পারবে।
বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ডলারের আধিপত্য রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতায় বিকল্প পেমেন্ট অবকাঠামোর গুরুত্ব বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে চীনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম বা সিআইপিএস নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২০১৫ সালে চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো চীনা মুদ্রা রেনমিনবি বা ইউয়ানভিত্তিক আন্তর্জাতিক লেনদেনকে সহজ করা। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে চীনা মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবেও এটি বিবেচিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সীমান্তপারের লেনদেন সম্পন্ন করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থায় যত বেশি বিকল্প থাকবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য তত বেশি সুযোগ তৈরি হবে। কারণ একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ কারণে সিআইপিএসকে তারা সম্ভাবনাময় একটি বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে এটিও স্পষ্ট যে, শুধু কোনো নতুন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হলেই বড় ধরনের সুবিধা নিশ্চিত হবে না। এর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে চীনা মুদ্রার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতার ওপর।
বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার চীন। কিন্তু দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যে বড় ধরনের অসমতা রয়েছে। বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ পণ্য চীন থেকে আমদানি করলেও রপ্তানির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে ইউয়ানভিত্তিক লেনদেনের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করতে হলে বাণিজ্যের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও অর্থপ্রবাহও বাড়াতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চীনা বিনিয়োগ, অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন এবং ঋণ সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলে ইউয়ানভিত্তিক আর্থিক প্রবাহও বাড়বে। তখন সিআইপিএসের মাধ্যমে সরাসরি লেনদেনের বাস্তব সুবিধা পাওয়া সহজ হবে। অন্যথায় আন্তর্জাতিক নিষ্পত্তির জন্য আবারও ডলার ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চীন এর আগেও বাংলাদেশকে তাদের পেমেন্ট নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় বিকল্প অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ার পর বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এটি ভবিষ্যতে প্রচলিত আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি অতিরিক্ত বিকল্প চ্যানেল হিসেবে কাজ করতে পারে।
বৈঠকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পান্ডা বন্ড। এটি এমন এক ধরনের ঋণপত্র, যা বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ডবাজারে ইউয়ান মুদ্রায় ইস্যু করতে পারে। এর মাধ্যমে সরাসরি চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ইতোমধ্যে এ ধরনের বন্ডের মাধ্যমে চীনা বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি ভবিষ্যতে অর্থায়নের একটি বিকল্প উৎস হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি মূলত সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় এ বিষয়ে নেতৃত্ব দেবে অর্থ মন্ত্রণালয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত নেওয়া হবে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য ব্যয়, ঝুঁকি, মুদ্রা বিনিময় হার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো গভীরভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
এদিকে বুধবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চীনা প্রতিনিধি দলের আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বিনিয়োগ, অর্থায়ন এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড—দুই ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ থেকে প্রকৃত সুবিধা পেতে হলে শুধু নতুন আর্থিক কাঠামো গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়। বরং চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, রপ্তানি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তাদের মতে, বর্তমান আলোচনাগুলো তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত না দিলেও ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য নতুন আর্থিক বিকল্প তৈরির পথ উন্মুক্ত করতে পারে। বিশেষ করে বহুমুখী অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থার দিকে এগোনোর ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

