জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনা দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী শিবিরের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, দেশের অন্যতম বৃহৎ এই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা নিয়ে মতভেদ এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, সরকার ব্যাংকটির পরিচালনায় বিতর্কিত ব্যক্তিদের বসিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। তার বক্তব্যে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একই সঙ্গে তিনি সরকারের কাছে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ইসলামী ব্যাংক সম্পর্কে যদি কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে তা জনগণের সামনে শ্বেতপত্র আকারে প্রকাশ করা উচিত।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকটিতে ব্যাপক প্রশাসনিক ও মানবসম্পদ পরিবর্তন ঘটেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগ, পদোন্নতি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপসারণের ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যা তদন্ত ও পর্যালোচনার দাবি রাখে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল ব্যাংক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের সম্পর্ক নিয়ে তার মন্তব্য। তিনি বলেন, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে একাকার করে দেখা উচিত নয়। তার মতে, একটি ব্যাংকের মূল দায়িত্ব হলো আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আর্থিক সেবা প্রদান করা; সেটিকে রাজনৈতিক বা আদর্শিক প্রভাবমুক্ত রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সংসদে আলোচনার সময় অতীতের ঘটনাও উঠে আসে। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির মালিকানা ও পরিচালনায় পরিবর্তনের পর এস আলম গ্রুপের প্রভাব বিস্তার এবং বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিও আবার আলোচনায় আসে। সমালোচকদের মতে, ওই সময় ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়ে। তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বরাবরই এসব অভিযোগের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছে।
অর্থমন্ত্রীও আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, কোনো ব্যাংক কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি হতে পারে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা রক্ষা, আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং আর্থিক অনিয়ম প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক আসলে দেশের ব্যাংকিং খাতের বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন। বহু বছর ধরে বিভিন্ন ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাতমূলক নিয়োগ, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ সুবিধা এবং দুর্বল করপোরেট সুশাসনের অভিযোগ উঠে এসেছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীকে দায়ী করার চেয়ে পুরো ব্যবস্থার সংস্কারই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তাদের মতে, একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া যদি রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে থেকে পরিচালিত না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে আমানতকারী, বিনিয়োগকারী এবং সামগ্রিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
ইসলামী ব্যাংক দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংকগুলোর একটি। কোটি কোটি গ্রাহকের আমানত, বিনিয়োগ ও আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি জড়িত। ফলে ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সংসদে ওঠা অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের সত্যতা যাচাই, নিয়োগ ও পদোন্নতির বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অতীত ও বর্তমানের সব ধরনের অনিয়মের স্বচ্ছ অনুসন্ধানই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে। কারণ রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে সাধারণ আমানতকারীরা মূলত একটি বিষয়ই জানতে চান—তাদের কষ্টার্জিত অর্থ কতটা নিরাপদ এবং ব্যাংকটি কতটা সুশাসনের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রভাব নয়; যোগ্যতা, নীতি এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনাই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি। তবেই ব্যাংকটির প্রতি জনগণের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে এবং ব্যাংকিং খাতেও ইতিবাচক বার্তা যাবে।

