চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে দেশে কৃষি ও পল্লী খাতে ঋণ বিতরণ ও আদায়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও একই সময়ে খেলাপি ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, খাতটিতে একদিকে যেমন অর্থায়ন বাড়ছে, অন্যদিকে ঝুঁকিও বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক–এর তথ্য বলছে, জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণ হয়েছে ২৭ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এটি প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের এই সময়ে বিতরণ ছিল ২২ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। পুরো অর্থবছরের জন্য কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা।
ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ধারা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে আদায় হয়েছে ২৭ হাজার ৭৬৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ, বিতরণ বাড়ার পাশাপাশি আদায়ও কিছুটা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় খেলাপি ঋণ। ফেব্রুয়ারি শেষে কৃষিখাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ৯১৫ কোটি টাকায়, যা এক বছরের ব্যবধানে দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের বছর একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের দুর্বল তদারকি, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম পরিবর্তনের কারণে খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়েছে। এতে নিম্ন আয়ের কৃষকদের আর্থিক চাপও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেসব ব্যাংকের গ্রামীণ এলাকায় শাখা নেই, তাদের এনজিওর মাধ্যমে ঋণ বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধিত সংস্থাগুলোর ওপর সুদের হার নিয়ন্ত্রণও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন এবং গ্রামীণ ব্যাংক–সহ বড় সংস্থাগুলো মিলিয়ে প্রায় ১৭ হাজার ২৩১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থ প্রবাহ বাড়লেও খেলাপি ঋণের চাপও সমানভাবে বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে এই খাতে ঋণ বিতরণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকগুলোকে তাদের মোট ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ কৃষিখাতে দিতে বাধ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন নীতিমালায় প্রাণিসম্পদ, কৃষিযন্ত্র, সেচ এবং নতুন ফসল খাতে ঋণ বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া ক্ষুদ্র কৃষকদের সহায়তায় নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে সিআইবি চার্জ মওকুফ, এজেন্ট ব্যাংকিং সম্প্রসারণ এবং চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে, কৃষিঋণ প্রবাহ বাড়লেও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি এই খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। টেকসই উন্নয়নের জন্য ঋণ বিতরণের পাশাপাশি কার্যকর তদারকি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি।

