রাজস্ব ঘাটতি বাড়তে থাকায় সরকার ক্রমেই ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি কঠিন করে তুলতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এতে ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
রাজধানীতে আয়োজিত এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থনীতিবিদদের সংগঠন জানায়, রাজস্ব ঘাটতি অব্যাহত থাকলে আগামী অর্থবছরগুলোতে সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ আরও বাড়বে। এর ফলে “ক্রাউডিং আউট” বা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে সরকারের বেশি ঋণ নেওয়ার কারণে বেসরকারি খাতের জন্য ব্যাংকে ঋণের সুযোগ কমে যায়।
সংগঠনটির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে সরকারের ব্যাংক ঋণ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। পরবর্তী অর্থবছরে তা বেড়ে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকায় যেতে পারে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪.৫ থেকে ৫ শতাংশে থাকতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ৮৮ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ৪ হাজার ৩৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আসন্ন বাজেটে সরকারের ওপর ব্যয়ের চাপ আরও বাড়বে। বেতন কাঠামো সমন্বয়, পরিবারভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি, কৃষি ভর্তুকি এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাত সম্প্রসারণের মতো প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণেও সরকারের ব্যয় বাড়বে।
এদিকে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়লে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেতে পারে, যার ফলে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে।
রাজস্ব বাড়ানোর উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতিকে করের আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন। এতে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন। কর ফাঁকি রোধেও জোরালো পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে আবাসন খাত, সম্পদ কর এবং ব্যক্তিগত সম্পদের তথ্য গোপনের ক্ষেত্রে নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের মোট রাজস্বের প্রায় ২৮ শতাংশ আসে আমদানি ও বাণিজ্য শুল্ক থেকে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তুলনামূলকভাবে বেশি। তাই রাজস্ব কাঠামো আরও বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
কর প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় বড় ধরনের সংস্কারে সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় দ্বিধা দেখা দেয়। তবুও কর ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার বিষয়ে কাজ চলছে। অন্যদিকে বিভিন্ন সংগঠন কর ন্যায্যতা নিশ্চিত করা, নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দেয়া এবং কর ফাঁকি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
তামাকপণ্যের কর কাঠামো নিয়েও প্রস্তাব এসেছে। সিগারেটের বিভিন্ন স্তর একীভূত করে দাম বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট আবগারি শুল্ক আরোপ করলে অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া করনীতি ও কর প্রশাসনকে পৃথক করার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়ার প্রস্তাব এসেছে। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও প্রকৃত করদাতার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, সেটিও কমিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাজস্ব ঘাটতি কমানো, কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো না গেলে সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়তেই থাকবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর।

