দেশীয় ব্যাংক খাতে প্রথমবারের মতো হাজার কোটি টাকার মুনাফা অর্জন করে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে পূবালী ব্যাংক। ২০২৫ অর্থবছর শেষে ব্যাংকটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। ফলে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকের পর দেশীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যে পূবালী ব্যাংকও এখন এই বিশেষ মুনাফার ক্লাবে জায়গা করে নিল।
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের সাম্প্রতিক বৈঠকে অনুমোদিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যেখানে মুনাফা ছিল ৭৮০ কোটি টাকা, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়েছে ৩১১ কোটি টাকা। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই তথ্য বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকাশ করা হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে।
শুধু মুনাফাই নয়, শেয়ারধারীদের জন্য লভ্যাংশও বাড়িয়েছে ব্যাংকটি। ২০২৫ সালের জন্য মোট ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫ শতাংশ নগদ এবং ১৫ শতাংশ বোনাস শেয়ার। আগের বছরের তুলনায় এটি ৫ শতাংশ বেশি। ঘোষিত লভ্যাংশ অনুযায়ী, প্রতি ১০০ শেয়ারের বিপরীতে বিনিয়োগকারীরা পাবেন ১৫০ টাকা নগদ এবং ১৫টি অতিরিক্ত শেয়ার।
ব্যাংকের আয় কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঋণ থেকে সুদ আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে এই খাতে আয় হয়েছে ৬ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৫২ কোটি টাকা বেশি। তবে একই সময়ে আমানতের সুদ ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে। এ খাতে খরচ হয়েছে ৫ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা, যা এক বছরে প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকৃত সুদ আয় কমে দাঁড়িয়েছে ৯৫৩ কোটি টাকায়, যেখানে আগের বছর ছিল ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ সুদ আয়ের চাপ থাকলেও ব্যাংকটির সামগ্রিক মুনাফা কমেনি, বরং বেড়েছে। এর মূল কারণ অন্যান্য আয় উৎসের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি।
বিশেষ করে সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে আয় বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালে এই খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭২ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি কমিশন, ব্রোকারেজসহ অন্যান্য আয়ও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়। পরিচালন ব্যয়, কর এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে সংরক্ষণ রাখার পর চূড়ান্ত মুনাফা দাঁড়ায় ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা।
ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, সুশাসন ও কম খেলাপি ঋণই এই সাফল্যের প্রধান ভিত্তি। বর্তমানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ, যা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অধিকাংশ ঋণ ও সম্পদ থেকেই আয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
তাদের মতে, এখনো ব্যাংকের আয়ের প্রধান উৎস সুদ আয়। গত বছর প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করা হয়েছে এবং প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এই দুই উৎস থেকেই আয়ের বড় অংশ এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুদ আয়ের মার্জিন কমলেও বিনিয়োগ আয় ও অন্যান্য উৎসে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি থাকায় পূবালী ব্যাংক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পেরেছে। এটি দেশের ব্যাংক খাতে বহুমুখী আয়ের কৌশলের একটি উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

