অলস অর্থ নিরাপদভাবে বিনিয়োগের নতুন পথ হিসেবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড। সঞ্চয়পত্র বা এফডিআরের বিকল্প হিসেবে এগুলো এখন বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়ছে, কারণ প্রায় সমপর্যায়ের এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বেশি মুনাফার সুযোগ মিলছে এই খাতে।
সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড মূলত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নেওয়া ঋণপত্র, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত। স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ট্রেজারি বিল ব্যবহৃত হয়, যার মেয়াদ সাধারণত ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন। এগুলো মূল দামের চেয়ে কম দামে কেনা হয় এবং মেয়াদ শেষে পূর্ণ মূল্য ফেরত পাওয়া যায়—এভাবেই লাভ তৈরি হয়।
অন্যদিকে ট্রেজারি বন্ড দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সুযোগ দেয়। ২ বছর থেকে শুরু করে ২০ বছর পর্যন্ত মেয়াদে এসব বন্ড ইস্যু করা হয়। নির্দিষ্ট সুদহার অনুযায়ী বছরে দুইবার কুপন সুদ দেওয়া হয়, যা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল আয়ের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত।
সুদের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে ট্রেজারি বিলের মুনাফা ১০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। ৯১ দিনের বিল প্রায় ১০.১৭ শতাংশ, ১৮২ দিনের বিল ১০.৪৯ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিনের বিল প্রায় ১০.৬৪ শতাংশ হারে রিটার্ন দিচ্ছে। অন্যদিকে ট্রেজারি বন্ডে মুনাফা আরও কিছুটা বেশি। ৫ বছরের বন্ডে প্রায় ১০.৭৫ শতাংশ, ১০ বছরের বন্ডে ১০.৯৮ শতাংশ এবং ২০ বছরের বন্ডে প্রায় ১১.২৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদ পাওয়া যাচ্ছে।
এই হারগুলো সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকের স্থায়ী আমানতের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক। ফলে বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে এই খাতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে যারা দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য ও স্থিতিশীল আয় চান, তাদের জন্য ট্রেজারি বন্ড আকর্ষণীয় বিকল্প হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বিনিয়োগের প্রক্রিয়াটিও তুলনামূলক সহজ। সরকার নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী বিল ও বন্ড ইস্যু করে এবং প্রাইমারি ডিলার ব্যাংকগুলো নিলামের মাধ্যমে সেগুলো কিনে নেয়। পরে এসব ব্যাংকের মাধ্যমেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অংশ নিতে পারেন। চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিলামেও ব্যাংকের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করা যায়।
দেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে এসব সিকিউরিটিজ কেনা সম্ভব। বিনিয়োগ করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি বিশেষ হিসাব খুলতে হয়, যার জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, কর শনাক্তকরণ নম্বর ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রয়োজন হয়।
ন্যূনতম বিনিয়োগের পরিমাণ এক লাখ টাকা হলেও সর্বোচ্চ সীমা নেই, যা বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে। ব্যক্তি ছাড়াও ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি ও করপোরেট সংস্থাও এই খাতে বিনিয়োগ করতে পারে।
বিশেষ দিক হলো, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও এসব বিল ও বন্ড বাজারে বিক্রি করা যায়। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী তারল্য পাওয়ার সুযোগ থাকে, যা অনেক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সীমিত থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে বন্ড বাজারকে আরও গতিশীল করতে নতুন করে দুটি বেসরকারি ব্যাংককে প্রাইমারি ডিলার হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ সুদহার, সরকারি নিশ্চয়তা এবং তারল্যের সুবিধা—এই তিন কারণে ট্রেজারি বিল ও বন্ড ভবিষ্যতে দেশের বিনিয়োগ খাতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে অনিশ্চিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বাড়লে এই খাতের বিস্তার আরও দ্রুত হতে পারে।

