রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষে থাকা সোনালী ব্যাংক ২০২৫ সালে ইতিহাসের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করেছে। অডিট করা আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি। মূলত বিনিয়োগ থেকে আয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি এই সাফল্যের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংকটির আয়ের বড় অংশ এসেছে সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ থেকে। এই খাত থেকে আয় এক বছরে প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ঝুঁকিমুক্ত এবং স্থিতিশীল রিটার্নের কারণে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বাড়ানো ব্যাংকটির জন্য লাভজনক সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যেখানে বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেখানে সরকারি বন্ডে ঝোঁক বাড়ানো অনেক ব্যাংকেরই কৌশলগত পদক্ষেপ হয়ে উঠেছে।
তবে মুনাফার এই উল্লম্ফনের বিপরীতে ব্যাংকটির মূল ব্যাংকিং কার্যক্রমে দুর্বলতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালে নিট সুদ আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এ খাতে আয় ৭৭ শতাংশ হ্রাস পেয়ে মাত্র ৩৩৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এর প্রধান কারণ হিসেবে ঋণ থেকে সুদ আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের ওপর বেশি সুদ পরিশোধের চাপকে দায়ী করা হচ্ছে। অর্থাৎ, ব্যাংকটির প্রচলিত ঋণভিত্তিক আয়ের জায়গা সংকুচিত হলেও বিকল্প বিনিয়োগ থেকে আয় সেই ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মুনাফা কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে। কারণ একটি ব্যাংকের মূল শক্তি হওয়া উচিত ঋণ বিতরণ ও সুদ আয়ের ধারাবাহিকতা। কিন্তু সেখানে দুর্বলতা থাকলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস-এও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির ইপিএস বেড়ে ২৮ টাকা ৯৯ পয়সায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরে ছিল ২১ টাকা ৮২ পয়সা। বিনিয়োগ থেকে উচ্চ আয়ের প্রভাবই এই বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, সোনালী ব্যাংকের সাম্প্রতিক মুনাফা প্রবৃদ্ধি একদিকে যেমন শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে এটি ব্যাংকটির আয় কাঠামোর পরিবর্তনের দিকটিও সামনে নিয়ে এসেছে। ভবিষ্যতে টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে ঋণখাতে কার্যকারিতা বাড়ানো এবং সুদ আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

