দেশের ব্যাংকিং খাতে যখন আস্থার সংকট, তারল্যচাপ ও খেলাপি ঋণের উদ্বেগ বাড়ছে, তখন ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে ঘিরে নতুন করে গুরুত্বের আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের সবচেয়ে বড় আমানতভিত্তিক এই ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি গ্রাহকের সঙ্গে সম্পৃক্ত ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। একইসঙ্গে শিল্প বিনিয়োগ, রেমিট্যান্স আহরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ইসলামী ব্যাংকিং খাতের আমানতের প্রায় ৩৯ শতাংশ এককভাবে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বড় আমানতভিত্তি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলার সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও ইসলামী ব্যাংক তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আহরণে ব্যাংকটির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক বড় ভূমিকা রেখেছে।
তথ্য অনুযায়ী, দেশে আসা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ১৯ শতাংশ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে। প্রায় ৫০ লাখ প্রবাসী নিয়মিত এই ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠান। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ধরে রাখা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের সরবরাহ বজায় রাখতে ব্যাংকটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দেশব্যাপী প্রায় ৪০০ শাখা, শত শত উপশাখা এবং কয়েক হাজার এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে ব্যাংকটি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আর্থিক সেবা পৌঁছে দিয়েছে। কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবা বিস্তারে প্রতিষ্ঠানটির অবদান উল্লেখযোগ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল শক্তি হচ্ছে ঝুঁকি ও মুনাফা ভাগাভাগিভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সুদভিত্তিক প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বাইরে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের মধ্যে আলাদা আস্থা তৈরি করেছে। ফলে ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি নিরাপদ ও নৈতিক ব্যাংকিং ধারণার কারণেও ব্যাংকটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটিকে ঘিরে বিভিন্ন আলোচনা, গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংক নিয়ে নেতিবাচক অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তা পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতে পারে।
ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশের কোটি মানুষের আস্থা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বড় অংশের সঙ্গে জড়িত। তার মতে, গ্রাহকদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, শক্তিশালী আমানতভিত্তি, বিস্তৃত গ্রাহক নেটওয়ার্ক এবং ধারাবাহিক রেমিট্যান্স প্রবাহ ইসলামী ব্যাংককে দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তিতে পরিণত করেছে। তাই ব্যাংকটির স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা ফিরিয়ে আনা। বড় কোনো ব্যাংককে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তা দ্রুত অন্য ব্যাংকেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকার এবং ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক বছরে প্রযুক্তিনির্ভর ইসলামী ব্যাংকিং আরও বিস্তৃত হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল ফিন্যান্স এবং শরিয়াহভিত্তিক স্মার্ট বিনিয়োগব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক নতুন যুগে প্রবেশ করতে পারে। একইসঙ্গে অবকাঠামো, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন খাতে ইসলামী অর্থায়নের গুরুত্বও বাড়বে।
তাদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল রাখতে বড় ও আস্থাভিত্তিক ব্যাংকগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ কোনো বৃহৎ ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা নড়ে গেলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।

