দেশের সংকটাপন্ন ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়ন প্রক্রিয়া বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছে। প্রায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার তহবিল ঘাটতির কারণে ছয়টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন কার্যক্রম থমকে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা আমানতের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে নতুন করে উদ্বেগে পড়েছেন হাজারো গ্রাহক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় চলতি অর্থবছরে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে আমানতকারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে শতাধিক আমানতকারী মুখে কালো কাপড় বেঁধে নীরব প্রতিবাদ করেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও টাকা ফেরতের বিষয়ে এখনও কোনো কার্যকর রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়নি। আন্দোলনকারীরা বলেন, সাবেক গভর্নরের ঘোষণায় ২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে অর্থ ফেরতের যে সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল, সেটি এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
একজন আমানতকারী বলেন, বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও তারা নিজেদের সঞ্চয়ের টাকা তুলতে পারছেন না। অবসরের অর্থ, জমি বিক্রির টাকা কিংবা জীবনের সঞ্চয় এসব প্রতিষ্ঠানে রেখে এখন অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সরকার আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে অর্থ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছিল। সেই নিশ্চয়তার ভিত্তিতেই লিকুইডেশন প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের অন্যান্য সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের ব্যয় হওয়ায় প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না।
তার ভাষ্য, সরকার থেকে অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত হলেই অবসায়ন কার্যক্রম শুরু হবে এবং তখন আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়াও চালু হবে। তিনি আরও বলেন, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা এতটাই দুর্বল যে সেগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ নেই। তাই একীভূত করার পরিবর্তে সরাসরি অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ ছয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের অনুমোদন দেয়। এগুলো হলো—এফএএস ফাইন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার ৭৫ শতাংশ থেকে প্রায় ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অবসায়নের প্রস্তুতিমূলক কাজ অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। তবে পুরো প্রক্রিয়া এখন সরকারি তহবিলের ওপর নির্ভর করছে। গভর্নরের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
এদিকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনিশ্চয়তার কারণে প্রতিদিন আমানতকারীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু তাদের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো যাচ্ছে না। এতে ক্ষোভ বাড়ছে।
তিনি আরও জানান, অনেক আমানতকারী চিকিৎসা খরচ চালাতে না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমনকি অর্থাভাবে চিকিৎসা না পেয়ে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ছয়টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১২ হাজার আমানতকারীর প্রতিনিধিত্বকারী একটি জোট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছে। গভর্নরের কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে তারা উল্লেখ করেছে, সাত বছর ধরে সঞ্চয় আটকে থাকায় বহু পরিবার আর্থিক ও মানসিক সংকটে পড়েছে। ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগে আক্রান্ত অনেকে চিকিৎসা করাতেও ব্যর্থ হচ্ছেন।
তাদের দাবি, জনগণের আমানত সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এড়াতে পারে না। তাই দ্রুত স্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা ও অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাত এখন গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০টিকেই সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা মোট ঋণের ৮৩ শতাংশেরও বেশি।
অন্যদিকে ভালো অবস্থানে থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখনও মুনাফা করছে এবং তাদের মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে। ফলে পুরো খাতের ভেতরেই বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ধারণা, সমস্যাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত ও পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনায় প্রাথমিকভাবে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে অবসায়নের পর কর্মচারীদের চাকরিসংক্রান্ত সুবিধাও পরিশোধ করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়মিত ঋণ বিতরণ এবং খেলাপি সংস্কৃতির কারণে দেশের এনবিএফআই খাত ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে। এখন দ্রুত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত না এলে শুধু আমানতকারীরাই নয়, পুরো আর্থিক খাতের ওপর আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে।

