সংকটে থাকা ইসলামী ব্যাংকগুলো সাবেক মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করায় বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ব্যাংক খাত সংস্কারসংক্রান্ত সাম্প্রতিক আইন সংশোধনে অসন্তোষ জানিয়েছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
সরকার সম্প্রতি ‘ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬’ পাস করে। এর মাধ্যমে আগের অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশে পরিবর্তন আনা হয়। সংশোধিত আইনে এমন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে একীভূত বা একীভূতকরণের তালিকায় থাকা ব্যাংকের সাবেক মালিকরা সহজ শর্তে আবারও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার আবেদন করতে পারবেন।
আইন অনুযায়ী, সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে অর্থ সহায়তা দিয়েছে তার মাত্র ৭ দশমিক ৫ শতাংশ পরিশোধ করেই সাবেক মালিকরা ব্যাংক ফেরতের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন। বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিবিদ, সুশাসনকর্মী এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, অতীতে যাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক লুট, অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তাদের জন্য নতুন করে পথ খুলে দেওয়া হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। বিশেষ করে আইএমএফ ব্যাংক খাত পুনর্গঠন ও দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
কিন্তু নতুন সরকারের অবস্থান উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কর্মকর্তাদের দাবি, যেসব মালিকের বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাদের ফের নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ অসন্তুষ্ট।
সরকারি সূত্র বলছে, আইএমএফের ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় পরবর্তী দুই কিস্তির প্রায় ১৩০ কোটি ডলার ছাড়ে বিলম্ব হওয়ার পেছনেও এই বিষয়টি প্রভাব ফেলেছে। উন্নয়ন সহযোগীরা ব্যাংক খাতে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে দেখতে চাইছে।
এদিকে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে তৈরি হওয়া বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে সরকার সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা চেয়েছে। তবে বিশ্বব্যাংক এ সহায়তার বিপরীতে কয়েকটি শর্ত দিয়েছে বলে জানা গেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের সেই ধারা বাতিল করা, যেটি সাবেক মালিকদের ব্যাংক পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেয়। পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিভাজন, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, মূল্য সংযোজন করের একক হার চালু এবং করপোরেট কর কমানোর মতো সংস্কারমূলক পদক্ষেপও চেয়েছে সংস্থাটি।
অর্থ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উন্নয়ন সহযোগীরা এখন শুধু অর্থ সহায়তা নয়, বাস্তব সংস্কারের নিশ্চয়তাও চাইছে। অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে বাজেট সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজন হলেও সংস্কার ছাড়া তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কিন্তু উন্নয়ন সহযোগীরা আর শুধু প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট নয়, তারা বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চাইছে।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও অনিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, নতুন আইনের মাধ্যমে ‘চিহ্নিত লুটেরাদের পুনর্বাসনের’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
টিআইবির মতে, এতে ব্যাংক খাত আবারও দুর্নীতি ও অর্থ লুটের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন ও জবাবদিহিহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বড় ধরনের আস্থাসংকটে রয়েছে। খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলোকে পুনরুদ্ধারে কঠোর সংস্কার প্রয়োজন। এমন অবস্থায় পুরোনো মালিকদের ফেরত আনার সুযোগ আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, ব্যাংক খাতে সংস্কার প্রক্রিয়া দুর্বল হলে শুধু বিদেশি সহায়তা নয়, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও আর্থিক সহযোগিতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

