দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো একসময় শিল্পায়ন ও সরকারি অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি ছিল। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এসব ব্যাংকের অর্থায়নে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনিয়ম, দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এই ব্যাংকগুলোর অনেকগুলোই এখন চরম আর্থিক চাপে পড়েছে। সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, চার রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের মধ্যে শুধু সোনালী ব্যাংক শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিপরীতে জনতা ব্যাংক বড় ধরনের লোকসানে ডুবে গেছে। অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকও বিশেষ সুবিধা ছাড়া মুনাফা দেখাতে পারত না।
গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে সোনালী ব্যাংক। ব্যাংকটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা। আগের বছর এই মুনাফা ছিল ৯৮৮ কোটি টাকা। দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে মুনাফার দিক থেকে সোনালী এখন তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এর আগে রয়েছে বেসরকারি খাতের দুটি ব্যাংক।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় শিল্পঋণ কমিয়ে এনে তুলনামূলক নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কৌশলই সোনালী ব্যাংককে ভালো অবস্থানে নিয়ে গেছে। ব্যাংকটি বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করেছে। উচ্চ সুদহার থেকে সেখানে বড় অঙ্কের আয় এসেছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ভোক্তা ঋণে গুরুত্ব দেওয়ায় ঝুঁকিও কিছুটা কমেছে।
ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে তাদের কোনো মূলধন ঘাটতি নেই। খেলাপি ঋণের চাপও অন্য রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের তুলনায় কম। ফলে নিরাপত্তা সঞ্চিতি গঠনে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হয়নি। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ বড় ঋণের পরিবর্তে তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ নীতিই তাদের মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করেছে।
অন্যদিকে জনতা ব্যাংকের পরিস্থিতি দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত বছরের শেষে ব্যাংকটির লোকসান বেড়ে প্রায় ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আগের বছরও ব্যাংকটি ৩ হাজার কোটির বেশি লোকসানে ছিল। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে খেলাপি ঋণ ঘিরে। ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই এখন খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ঋণ বিতরণই জনতা ব্যাংককে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকে এখন ব্যবসায়িক সংকটে, কেউ আইনি জটিলতায়, আবার কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে ব্যাংকের পক্ষে ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যত কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় ব্যাংকটির সুদ আয় কমে গেছে। কিন্তু আমানতকারীদের সুদ পরিশোধের চাপ রয়ে গেছে। ফলে পরিচালন ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যাংকটিকে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ঋণ আদায়ের চেষ্টা বাড়ানো হয়েছে, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না।
অগ্রণী ব্যাংকের পরিস্থিতিও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। কাগজে-কলমে ব্যাংকটি সামান্য মুনাফা দেখালেও বাস্তবে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে। আগের বছর প্রায় ৯২৫ কোটি টাকা লোকসান করা ব্যাংকটি এবার ৫৮ কোটি টাকা মুনাফা দেখিয়েছে। তবে এর পেছনে রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ ছাড়।
ব্যাংকটির বিপুল নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি রয়েছে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করার পরই প্রকৃত মুনাফা হিসাব করতে হয়। কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণ না করেই বিশেষ সুবিধার মাধ্যমে ব্যাংকটি মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। বাস্তবে তাদের সুদ আয়ও নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে বলে আর্থিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
রূপালী ব্যাংকের অবস্থাও প্রায় একই ধরনের। আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও ব্যাংকটির আর্থিক চাপ কম নয়। গত বছরের শেষে ব্যাংকটির মুনাফা কমে প্রায় ৭ কোটির নিচে নেমে এসেছে। তারাও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি পূরণ করতে পারেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাড় সুবিধার কারণেই সামান্য মুনাফা দেখানো সম্ভব হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর বর্তমান সংকটের মূল কারণ দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন এবং খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া। বড় শিল্পঋণগুলো ঝুঁকিতে পড়লেও সময়মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, শুধু বিশেষ ছাড় দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে টেকসই করতে হলে খেলাপি ঋণ আদায়, স্বচ্ছ পরিচালনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এসব ব্যাংকের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই চাপবে, যার প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।

