দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমাতে পুনঃতফসিল ও ঋণ পুনর্গঠন নীতির প্রভাব এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর শিথিল নীতিমালার আওতায় বিপুল পরিমাণ ঋণ নতুন করে নিয়মিত করায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক চাপ কিছুটা কমেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে স্বল্পমেয়াদে ব্যাংক খাতে স্বস্তি ফিরলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত ঝুঁকি মূল্যায়ন ও আদায় সক্ষমতা বাড়ানোই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা কমেছে। মূলত পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুযোগ বাড়ানোয় বিপুল সংখ্যক ঋণ আবার নিয়মিত হিসাবের আওতায় এসেছে।
এই নীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক-এ। ব্যাংকটি ২০২৫ সালে প্রায় ১ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ বেশি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, খেলাপি ঋণ কমে যাওয়ায় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকলেও মুনাফা বাড়াতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক যে পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়, তার ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই অনেক বড় অঙ্কের ঋণ নতুন শর্তে পুনর্গঠিত হয়। এতে ব্যাংকগুলোর আর্থিক বিবরণীতে চাপ কমে এবং খেলাপি ঋণের হারও নিচে নেমে আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুনঃতফসিল নীতি ব্যাংকগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি তৈরি করলেও এটি স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ, প্রকৃত আদায় সক্ষমতা না বাড়লে ভবিষ্যতে একই ঋণ আবারও খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কমানো এবং আর্থিক সূচক স্থিতিশীল রাখতে এই নীতি কার্যকর ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন তারা।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, অনেক গ্রাহক ব্যবসায়িক মন্দা ও উচ্চ সুদের চাপে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়েছিলেন। পুনঃতফসিল সুবিধার কারণে তারা নতুন সময়সূচি অনুযায়ী ঋণ পরিশোধের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্ক আরও কার্যকর হচ্ছে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি। শুধু হিসাবগতভাবে খেলাপি কমিয়ে আনলে দীর্ঘমেয়াদে প্রকৃত আর্থিক স্থিতিশীলতা আসবে না। এজন্য দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
এদিকে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহে কিছুটা ধীরগতি থাকলেও ব্যাংক খাতে চলমান সংস্কার ও নীতিগত সহায়তা ভবিষ্যতে আরও সংগঠিত আর্থিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

