এক সময় দেশের সীমিতসংখ্যক উচ্চবিত্ত মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা ক্রেডিট কার্ড এখন মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। নগদ অর্থের বিকল্প হিসেবে বাজার করা, হাসপাতালের বিল, অনলাইন কেনাকাটা, ভ্রমণ, শিক্ষা খরচ থেকে শুরু করে ইউটিলিটি বিল পরিশোধেও বাড়ছে এর ব্যবহার।
ব্যাংকগুলোর নতুন সুবিধা, ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার এবং সহজ অর্থ ব্যবস্থাপনার কারণে তরুণ প্রজন্ম ও চাকরিজীবীদের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে অনেক মানুষ মাসিক আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে ক্রেডিট কার্ডকে স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে সুদ ছাড়াই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খরচ করার সুযোগ থাকায় এটি নগদ টাকার চাপ কমাতে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ক্রেডিট কার্ড সংক্রান্ত নীতিমালায় বড় পরিবর্তন এনেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, জামানত ছাড়া সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা এবং জামানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্রেডিট সুবিধা পাওয়া যাবে। আগে এই সীমা ছিল যথাক্রমে ১০ লাখ ও ২০ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চিকিৎসা, বিদেশে পড়াশোনা, ব্যবসায়িক ভ্রমণ কিংবা জরুরি ব্যয়ের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত গ্রাহকদের জন্য বড় সহায়তা হবে।
নীতিমালায় কার্ডধারীদের জন্য আরও কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে। গ্রাহকরা তাদের মোট ক্রেডিট সীমার অর্ধেক পর্যন্ত নগদ অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন। যদিও নগদ উত্তোলনের ক্ষেত্রে সুদমুক্ত সময়সীমার সুবিধা কার্যকর হবে না।
ক্রেডিট কার্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হিসেবে ধরা হচ্ছে ‘গ্রেস পিরিয়ড’ সুবিধাকে। ব্যাংকভেদে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় পাওয়া যায়, যার মধ্যে পুরো বিল পরিশোধ করলে কোনো সুদ দিতে হয় না। ফলে জরুরি খরচ সামাল দিতে অনেকেই এটিকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
ব্যাংকারদের মতে, পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে ক্রেডিট কার্ড ব্যক্তিগত আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে আরও শৃঙ্খলিত করে। বেতনভিত্তিক চাকরিজীবী, ছোট উদ্যোক্তা ও তরুণ পেশাজীবীদের জন্য এটি এখন গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়ক হয়ে উঠেছে। অনেক ব্যাংক আবার গ্রাহক আকর্ষণে ক্যাশব্যাক, কিস্তিতে পণ্য কেনার সুবিধা, রেস্টুরেন্ট ও সুপারশপে ছাড়, বিমানবন্দরের লাউঞ্জ সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগও দিচ্ছে।
দেশে ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে কার্ড ব্যবহারের হারও দ্রুত বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড মিলিয়ে ৫ কোটির বেশি কার্ড চালু রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৪ লাখই ক্রেডিট কার্ড। প্রতি মাসে গড়ে কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে এসব কার্ডে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের ভেতরে সবচেয়ে বেশি কার্ড ব্যবহার হচ্ছে সুপারশপ, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ওষুধ, পোশাক, পরিবহন ও ইউটিলিটি বিল পরিশোধে। অন্যদিকে বিদেশে বাংলাদেশিরা শিক্ষা ব্যয়, কেনাকাটা ও যাতায়াত খাতে সবচেয়ে বেশি কার্ড ব্যবহার করছেন।
এক সময় বিদেশে লেনদেনের ক্ষেত্রে মূল ভরসা ছিল ক্রেডিট কার্ড। তবে এখন ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট কার্ডের ব্যবহারও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের কার্ডের ব্যবহার বেশি দেখা যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা দেশে টাকা জমা দিলেই বিদেশে থাকা শিক্ষার্থীরা সহজে তা ব্যবহার করতে পারছেন।
ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে। অনেক ব্যাংক এখন ওটিপি, বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কার্ড নিয়ন্ত্রণ, তাৎক্ষণিক ব্লক সুবিধা ও রিয়েল-টাইম নোটিফিকেশন চালু করেছে। সম্প্রতি মাস্টারকার্ড ও প্রাইম ব্যাংক দেশে প্রথমবারের মতো নম্বরবিহীন ডেবিট কার্ড চালু করেছে, যেখানে কার্ড নম্বর বা সিভিভি দৃশ্যমান থাকবে না।
একই সঙ্গে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের কারণে ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। এসব কার্ডে প্রচলিত সুদের পরিবর্তে নির্ধারিত সেবামূলক চার্জ বা উজরাহ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ধর্মীয় মূল্যবোধ বজায় রেখে আধুনিক আর্থিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকায় তরুণদের মধ্যেও এর চাহিদা বাড়ছে।
শুধু চাকরিজীবী নয়, এখন শিক্ষার্থী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্যও বিশেষ কার্ড চালু করছে ব্যাংকগুলো। সাউথইস্ট ব্যাংক সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ক্রেডিট কার্ড চালু করেছে। অন্যদিকে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ডুয়াল কারেন্সি সুবিধাসহ বিভিন্ন কার্ড চালু হওয়ায় আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও অনলাইন সেবার ব্যবহার সহজ হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অপরিকল্পিতভাবে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে তা আর্থিক চাপের কারণও হতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিল পরিশোধ না করলে উচ্চ সুদ যুক্ত হয় এবং দেনা দ্রুত বাড়তে থাকে। বিশেষ করে শুধু ন্যূনতম বিল পরিশোধ করে দীর্ঘ সময় বকেয়া রাখলে সুদের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে।
তাই প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত ব্যয় না করা, সময়মতো বিল পরিশোধ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা তথ্য গোপন রাখা এবং নিয়মিত লেনদেন পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ক্রেডিট কার্ড ভবিষ্যতে দেশের নগদবিহীন অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।

