দেশের ব্যাংক খাতে নতুন করে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি–এর সর্বশেষ আর্থিক চিত্র। ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংকটির মোট বিনিয়োগের অর্ধেকেরও বেশি এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে কোনো একক ব্যাংকের জন্য এত বড় পরিমাণ খেলাপি ঋণের ঘটনা আগে দেখা যায়নি।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকায়। এক বছর আগে এই হার ছিল তুলনামূলক কম। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় পুরো ব্যাংকিং খাতেই নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট ঋণ ও বিনিয়োগের প্রায় ৫১ শতাংশই অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সামগ্রিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশই এককভাবে ইসলামী ব্যাংকের। অর্থাৎ দেশের বৃহত্তম খেলাপি ঋণের ভার এখন এই একটি ব্যাংকের কাঁধে। তুলনামূলকভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক পিএলসি–এর খেলাপি ঋণও এর চেয়ে অনেক কম।
ব্যাংকটির বর্তমান কর্মকর্তাদের দাবি, অতীতের ব্যবস্থাপনায় বিপুল পরিমাণ ঋণ প্রকৃত অবস্থার বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপ–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিয়ে দীর্ঘদিন তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। নতুন ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করেছে বলে ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থাকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিয়ম অনুযায়ী যে পরিমাণ সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখার কথা ছিল, বাস্তবে তার সামান্য অংশ সংরক্ষণ করা হয়েছে। প্রয়োজন ছিল ৯২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা, কিন্তু সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯২২ কোটি টাকা। ফলে ৮৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
নিরীক্ষকদের মতে, এই বিশাল ঘাটতি আর্থিক প্রতিবেদনে পুরোপুরি সমন্বয় করা হলে ব্যাংকটির প্রকৃত লোকসান ও মূলধন সংকট আরও ভয়াবহ আকারে সামনে আসত। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নীতিগত সহায়তা ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে ব্যাংকটি স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকতে পারবে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে।
ব্যাংকটির মূলধন পরিস্থিতিও গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে যে পরিমাণ মূলধন থাকার কথা, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম মূলধন রয়েছে। দৃশ্যমান ঘাটতির পাশাপাশি প্রভিশন ঘাটতি পুরোপুরি বিবেচনায় নিলে প্রকৃত মূলধন সংকট প্রায় ৯৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যাংকটির মূলধন পর্যাপ্ততার হারও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সীমার অনেক নিচে নেমে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির সংকেত। কারণ মূলধন দুর্বল হয়ে গেলে আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষা, নতুন ঋণ বিতরণ এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যাংকটির বড় অংশের ঋণ গেছে এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে। স্টিল, চিনি, ভোজ্যতেলসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে গ্রুপটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুল পরিমাণ শেয়ার জব্দ করেছে।
এদিকে সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ ছাড় দিয়ে ব্যাংকটিকে পূর্ণ প্রভিশন সমন্বয় ছাড়া আর্থিক বিবরণী প্রকাশের অনুমতি দিয়েছে। তবে এর বিনিময়ে দ্রুত ঘাটতি কমানোর জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে।
ব্যাংকটির আর্থিক দুর্বলতার প্রভাব ইতোমধ্যে পুঁজিবাজারেও পড়েছে। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় শেয়ারবাজারে ব্যাংকটির অবস্থান অবনমন করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু নীতিগত সহায়তার ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে এমন বড় সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ব্যাংকটির পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি ব্যাংকের এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থার চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে আমানতকারী ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

