দেশের স্টার্টআপ খাতে দীর্ঘদিনের অর্থায়ন সংকট কাটাতে বড় উদ্যোগ নিল বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। প্রথমবারের মতো ব্যাংকগুলোর যৌথ মালিকানায় প্রাতিষ্ঠানিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি পিএলসি। প্রাথমিকভাবে ৪২৫ কোটি টাকার তহবিল নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগকে দেশের প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবনী খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি পাঁচতারকা হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্ল্যাটফর্মটির উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ব্যাংক–এর গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান। এছাড়া ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহী ও উদ্যোক্তারাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
প্ল্যাটফর্মটির উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তহবিলের পরিমাণ প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। দেশের ৩৯টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ব্যাংকগুলো প্রতিবছর তাদের নিট মুনাফার একটি অংশ এই তহবিলে জমা দেবে। ফলে এটি এককালীন বিনিয়োগভিত্তিক উদ্যোগ নয়; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তহবিলের আকার আরও বাড়বে।
নতুন এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সিড, লেট-সিড ও সিরিজ-এ পর্যায়ের স্টার্টআপে বিনিয়োগ করা হবে। অর্থাৎ প্রাথমিক ধারণা থেকে শুরু করে ব্যবসা সম্প্রসারণ পর্যায় পর্যন্ত প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তারা এখান থেকে অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। পুরো কার্যক্রম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত তদারকির আওতায় পরিচালিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের স্টার্টআপ খাতে এতদিন বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা বেশি ছিল। ফলে দেশীয় উদ্যোক্তাদের অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল অর্থায়ন পেতে সমস্যা হতো। নতুন এই প্ল্যাটফর্ম চালু হওয়ায় স্থানীয় মূলধনের একটি কাঠামোবদ্ধ উৎস তৈরি হলো, যা প্রযুক্তি, ফিনটেক, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি প্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবাখাতের নতুন উদ্যোক্তাদের বড় সহায়তা দিতে পারে।
অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, দেশের অর্থনীতি এখন নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে এবং সৃজনশীল অর্থনীতি বা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে এগিয়ে নিতে এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আশ্বাস দেন, এই বিনিয়োগ কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব বা হস্তক্ষেপ থাকবে না এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাত ও অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া সংকট মোকাবিলায় সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে। অতীতের দুর্বলতা কাটিয়ে নতুন কাঠামো গড়ে তুলতেই এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, দেশের আর্থিক খাতকে পরবর্তী ধাপে নিতে হলে উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানো জরুরি। তার মতে, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাদের কাছে দেশীয় মূলধন পৌঁছে দিতে এই প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও জানান, এর আগে বড় তহবিল গঠনের একটি উদ্যোগ সফল না হলেও পরে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফার নির্দিষ্ট অংশ দিয়ে টেকসই কাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাতে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এসেছে। তবে এর মধ্যে দেশীয় বিনিয়োগের অংশ ৭ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ অধিকাংশ অর্থায়ন এসেছে বিদেশি উৎস থেকে। নতুন প্ল্যাটফর্মটি সেই নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবনী ধারণা বাস্তবায়নে বড় বাধা ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থসংস্থান। ব্যাংকগুলো সাধারণত জামানত ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ নতুন উদ্যোগে অর্থায়নে আগ্রহ দেখাত না। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ শুরু হওয়ার আগেই থেমে যেত। ভেঞ্চার ক্যাপিটালভিত্তিক এই প্ল্যাটফর্ম সেই শূন্যতা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তারা মনে করছেন, শুধু অর্থায়ন দিলেই হবে না; বিনিয়োগ নির্বাচনে স্বচ্ছতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এই উদ্যোগ দেশের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার পথে বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

