দেশের ব্যাংক খাতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রশাসক সালাহ উদ্দিনকে হঠাৎ সরিয়ে দিয়ে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় আর্থিক খাতজুড়ে নানা গুঞ্জন ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এটি নিয়মিত প্রশাসনিক বদলির অংশ ছাড়া অন্য কিছু নয়।
সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক সার্কুলারের মাধ্যমে এই পরিবর্তন কার্যকর করা হয়। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল বসারকে ব্যাংকটির নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাবেক প্রশাসক সালাহ উদ্দিনকে রংপুর অফিসে বদলি করা হয়েছে। তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা অতিরিক্ত পরিচালক রাশেদুল ইসলামকেও ব্যাংকটি থেকে সরিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে।
মাত্র ছয় মাস আগে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে, সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সালাহ উদ্দিনকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে সরিয়ে দেওয়ায় ব্যাংকিং অঙ্গনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বড় কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চাপের সঙ্গে এই বদলির সম্পর্ক থাকতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু গ্রুপ শতভাগ সুদ মওকুফ, নিয়মের বাইরে ঋণ পুনঃতফসিল এবং নীতিগত ছাড় চেয়ে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। কিন্তু প্রশাসক হিসেবে সালাহ উদ্দিন এসব বিষয়ে অনড় অবস্থান নেন এবং অনৈতিক সুবিধা দিতে রাজি হননি। এরপর থেকেই তার সঙ্গে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর দূরত্ব তৈরি হয় বলে জানা গেছে।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব অভিযোগ নাকচ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, বদলিটি পুরোপুরি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময় পর ঢাকার বাইরে বদলির নীতিমালা রয়েছে এবং সেই নীতির আওতাতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দুর্বল ইসলামি ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার যে বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে এই প্রশাসনিক পরিবর্তন নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অধিকাংশই দীর্ঘদিন আর্থিক অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি ও গোষ্ঠীনির্ভর নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে আলোচিত ছিল।
পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক–কে একীভূত করে একটি সম্মিলিত ইসলামি ব্যাংক গঠন করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক দীর্ঘদিন এস আলম গ্রুপ–এর প্রভাবাধীন ছিল বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ ওঠে।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাবি করেছে, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেই এই একীভূতকরণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামোর ব্যাংকটি প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে। এর মধ্যে সরকার সরাসরি ২০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা দিয়েছে।
এছাড়া আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত তহবিল গঠন এবং আমানত বিমা তহবিল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৭৮ লাখ আমানতকারীকে সুরক্ষা দিতে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুর্বল ব্যাংক সংস্কারে প্রশাসক নিয়োগ ও একীভূতকরণ একটি কঠিন ও স্পর্শকাতর প্রক্রিয়া। এ ধরনের পরিবর্তনের পেছনে স্বচ্ছতা না থাকলে জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে ব্যাংক খাত যখন আস্থার সংকটে রয়েছে, তখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক পুনর্গঠনের এই উদ্যোগ সফল করতে হলে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় অতীতের অনিয়ম ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে এসে টেকসই সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

