দেশের ব্যাংক খাতে নতুন করে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচার ঠেকাতে বড় ঋণের ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর থেকে বিভিন্ন ব্যাংক ২০ কোটি টাকা বা তার বেশি যেসব ঋণ বিতরণ করেছে, সেসব ঋণের গ্রাহক ও প্রকৃত সুবিধাভোগীদের তথ্য যাচাই করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গভর্নরের নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি বিভাগগুলো সরাসরি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে বড় ঋণের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছে। এখন প্রতিটি ঋণের পেছনের প্রকৃত গ্রাহক, জামানতের অবস্থা, ঋণের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অতীত রেকর্ড যাচাই করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কেউ নতুন করে ঋণ সুবিধা পেয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। কোনো ঋণে অনিয়ম বা অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, সব ঋণ একসঙ্গে যাচাই করা হবে না। পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিটি ব্যাংকের কিছু বড় গ্রাহককে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত করা হবে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের করপোরেট ঋণগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন, ২০ কোটি টাকার বেশি সব নতুন ঋণের তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হবে। তিনি তখন বলেছিলেন, ঋণের প্রকৃত ব্যবহার, জামানতের বৈধতা এবং ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই করা হবে। একই সঙ্গে অনিয়ম ধরা পড়লে ব্যাংকের কর্মকর্তা ও পরিচালনা পর্ষদকেও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে ব্যাংক খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। এই সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৩ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে অন্যতম নিম্ন পর্যায়।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, উচ্চ সুদহার এবং দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশের কারণে নতুন ঋণের চাহিদা কমেছে। একই সময়ে প্রকৃত সুদহার বিবেচনায় নিলে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কার্যত ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকগুলোর গড় আমানত সুদহার ছিল ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ, আর ঋণের সুদহার ছিল প্রায় ১২ শতাংশ।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করেছে। প্রচলিত পরিদর্শনের পরিবর্তে এখন ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক বিভাগ যৌথভাবে ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ, ডিজিটাল লেনদেন তদারকি, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং আর্থিক ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিগত সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া বড় ঋণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এখন নতুন ঋণ বিতরণে কঠোর নজরদারি আরোপ করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং ভুয়া জামানতের বিপরীতে ঋণ অনুমোদনের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে বেনামি প্রতিষ্ঠান, অতিমূল্যায়িত প্রকল্প এবং কাগুজে সম্পদের বিপরীতে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।
শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যার বড় অংশই ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে সরানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এই অর্থের পরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকার বেশি।
এদিকে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং ১০টি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশে-বিদেশে মোট ৫৭ হাজার ২৫৭ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশে জব্দ হওয়া সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা।
ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু তদন্ত বা তথ্য সংগ্রহ নয়, ঋণ অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন আসবে না। বড় ঋণের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ, ঋণ অনুমোদন কমিটি এবং শাখা ব্যবস্থাপকদের দায়বদ্ধতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন তারা।

