দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের পুনর্গঠন শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়নের প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। একই সঙ্গে এ প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য আগামী বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের আশ্বাসও পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী জুলাই থেকে এসব প্রতিষ্ঠানকে ধাপে ধাপে অবসায়নের কার্যক্রম শুরু করা হবে।
অবসায়নের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠানগুলো চরম তারল্য সংকটে রয়েছে। গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া এবং বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ জমে যাওয়ার কারণে এগুলো কার্যত অচল অবস্থায় পৌঁছেছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের হার প্রায় শতভাগের কাছাকাছি, যা আর্থিক খাতের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র জানায়, ব্যাংক রেজুলেশন আইনের আওতায় এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনগতভাবে অকার্যকর ঘোষণা করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন করে কর্মকর্তা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি আরও কিছু কর্মকর্তা যুক্ত হয়ে সম্পদ ও দায়-দেনা ব্যবস্থাপনার কাজ করবেন।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধাপে ধাপে সম্পদ বিক্রি করে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে শুধু ব্যক্তিগত আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেই প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে জানা গেছে।
বৈঠকে জানানো হয়, সরকারের পক্ষ থেকে আগামী বাজেটে এ অর্থের জোগান রাখার বিষয়ে আশ্বাস পাওয়া গেছে। এই অর্থায়নের নিশ্চয়তার পরই অবসায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।
এর আগে উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার কারণে মোট ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় ধাপে ধাপে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত আসে।
বর্তমানে অবসায়নের আওতায় থাকা পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশ কয়েকটির খেলাপি ঋণ ৯০ শতাংশের বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা প্রায় শতভাগে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঋণ আদায় না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়, বরং অতীত সময়ে অনিয়ম ও ঋণ বিতরণে ব্যাপক দুর্নীতির ফলও এতে ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে আমানতকারীদের আস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পুরো আর্থিক খাতে চাপ তৈরি হয়েছে।
আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে খাতটিকে স্থিতিশীল করতে সহায়ক হতে পারে। তবে একই সঙ্গে আমানত ফেরত প্রক্রিয়া দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা না গেলে জনআস্থার সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

