দেশের ব্যাংক খাতে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে একেবারেই ভিন্নধর্মী চিত্র দেখা গেছে। একদিকে বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক ব্র্যাক ব্যাংক বড় মুনাফা করেছে, অন্যদিকে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে।
জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয়সহ সমন্বিত হিসাবে ব্র্যাক ব্যাংকের নিট মুনাফা হয়েছে ৫৭৭ কোটি টাকা। বিপরীতে একই সময়ে ইসলামী ব্যাংকের লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৮৮ কোটি টাকা। ব্যাংক দুটির প্রকাশিত শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ও মোট শেয়ারের হিসাব থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিপরীত চিত্র শুধু দুটি ব্যাংকের নয়, বরং পুরো ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থার প্রতিফলন। যেসব ব্যাংক সুশাসন ও ব্যাংকিং নিয়ম মেনে পরিচালিত হয়েছে, সেগুলোর মুনাফা বেড়েছে। আর যেসব ব্যাংকে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা রয়েছে, সেগুলো সংকটে পড়েছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে এখন পর্যন্ত ২৪টি ব্যাংক প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ২০টি ব্যাংক মুনাফা করেছে, আর চারটি ব্যাংক লোকসানের তথ্য দিয়েছে।
মুনাফা করা ব্যাংকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক লোকসানে রয়েছে।
তবে মুনাফা করলেও কয়েকটি ব্যাংকের আয় খুবই কম। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের বিপরীতে তাদের ইপিএস হয়েছে কয়েক পয়সা মাত্র। এর মধ্যে রয়েছে মার্কেন্টাইল ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মুনাফা করা ২০টি ব্যাংকের মোট সমন্বিত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে মুনাফা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ।
অন্যদিকে লোকসানে থাকা চার ব্যাংকের মোট ক্ষতির পরিমাণ ৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই লোকসান ছিল ৯৭৭ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে ন্যাশনাল ব্যাংক—১ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক, যার লোকসান ৮৬১ কোটি টাকা, এবং এবি ব্যাংকের লোকসান ৮২৬ কোটি টাকা।
ব্র্যাক ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঋণের বিপরীতে সুদ আয় বেড়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত তারল্য সরকারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করে বড় অঙ্কের আয় করেছে ব্যাংকটি। কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ আয়ও বেড়েছে। এসব কারণে ব্যাংকটির মুনাফায় শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এসেছে।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংক জানিয়েছে, আমানতের বিপরীতে বেশি মুনাফা প্রদান, খেলাপি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ আয় কমে যাওয়ায় তাদের লোকসান হয়েছে।
মুনাফার প্রবৃদ্ধির দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। ব্যাংকটির ইপিএস গত বছরের ৯২ পয়সা থেকে বেড়ে এবার হয়েছে ২ টাকা ৭০ পয়সা। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৯৩ শতাংশ। এরপর রয়েছে সিটি ব্যাংক, যার মুনাফা বেড়েছে ১৫৯ শতাংশ। সাউথইস্ট ব্যাংকের ইপিএসও ৪০ পয়সা থেকে বেড়ে ৯৯ পয়সায় পৌঁছেছে।
তবে সব ব্যাংকের চিত্র ইতিবাচক নয়। ব্যাংক এশিয়ার ইপিএস ১ টাকা ২৯ পয়সা থেকে কমে ৯৮ পয়সায় নেমেছে। ঢাকা ব্যাংকের ইপিএস ৮০ পয়সা থেকে ৫৬ পয়সায় এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ইপিএস ৮৪ পয়সা থেকে ২৯ পয়সায় নেমে এসেছে। প্রাইম ব্যাংকের মুনাফাও সামান্য কমেছে।

