বাংলাদেশ ব্যাংক চলমান সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে সম্মিলিত কাঠামোর মধ্যে রেখে তাদের পুনর্গঠন ও আর্থিক সুস্থতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখছে। এই ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা, তারল্য পরিস্থিতি উন্নয়ন এবং পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তবে বর্তমানে তাদের আলাদা করার কোনো পরিকল্পনা নেই।
গত ২৭ এপ্রিল পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন’ বিলের আলোচনার পর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের (এসআইবিএল) সাবেক পাঁচ পরিচালক ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ থেকে শেয়ার মালিকানা ফেরত পাওয়ার আবেদন করেছেন। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে পুনরায় পাঁচ ব্যাংকের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিত করেছে, এই প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আনা হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “যদিও একটি ব্যাংক পৃথক হওয়ার আবেদন করেছে, এটি স্বাভাবিক যে আগের উদ্যোক্তারা মালিকানায় ফিরে আসার চেষ্টা করবেন। তবে শেয়ার ফেরতের জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, তা ছাড়া মালিকানা ফেরত পাওয়ার সুযোগ নেই”।
বর্তমানে এই পাঁচ ব্যাংকের মালিকানা সরকারী তত্ত্বাবধানে রয়েছে। সরকার স্থায়ীভাবে মালিকানা গ্রহণ করেনি; বরং সাময়িকভাবে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাংকগুলোর স্বাস্থ্য ভালো করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ব্যাংক উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সংগঠন (বিএবি)-এর সঙ্গে বৈঠকে জানান, পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হবে না এবং ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সব পক্ষের মতামত নেওয়া হবে।
সংযুক্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি মনিটর করার জন্য পৃথক পর্যবেক্ষণ টিম কাজ করছে। এর মধ্যে আছে: তারল্য পরিস্থিতি, ঋণ আদায়, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং পরিচালন কাঠামোর নিয়মিত মূল্যায়ন। প্রয়োজনে বিশেষ সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। এই ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত আমানত ১ লাখ ৯৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা, যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংকে (৯৮%), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে (৯৬%), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে (৯৫%), সোশ্যাল ইসলামী শরিয়ায় (৬২%) এবং এক্সিম ব্যাংকে (৪৮%)।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, একীভূত অবস্থায় পরিচালনার ফলে ব্যয় সাশ্রয়, সম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সহজ হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের আমানত ও বিনিয়োগ সুরক্ষিত রাখাতেও এটি সহায়ক। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সাফল্য নির্ভর করবে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনার উপর।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ব্যাংক খাত সংস্কারে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কঠোর সিদ্ধান্তের পরিবর্তে আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পুনরুদ্ধারকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও ইতোমধ্যে বিশেষ নিরীক্ষা, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, অনিয়মিত ঋণ তদন্ত এবং ঝুঁকিভিত্তিক তদারকির মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়ন করছে।
অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সমস্যায় পড়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়। সরকারের প্রাথমিক মূলধন ২০ হাজার কোটি টাকা হলেও নতুন ব্যাংকের মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকায় স্থাপন করা হবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বর্তমানে পুনর্গঠন ও একীভূত কাঠামো কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সফল হতে হলে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

