বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে নতুন করে জটিলতা তৈরি করেছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। একদিকে পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত এই ব্যাংক নিয়ে সরকারের বড় অঙ্কের অর্থায়নের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে যেতে চাচ্ছে দুটি ব্যাংক। সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য বড় সিদ্ধান্তের জায়গায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত অবস্থান হলো—আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। এখন পর্যন্ত সরকার এ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী একীভূতকরণ প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ানোর আবেদন করেছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক। ব্যাংক দুটির কিছু সাবেক উদ্যোক্তা শুরু থেকেই পৃথকভাবে পরিচালনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক এই আবেদন গ্রহণের পক্ষে নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগতভাবে আবেদন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই আবেদনে প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে এবং বেশ কিছু অসঙ্গতিও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি আবেদনকারীরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাওনা পরিশোধে ১০ বছর সময় চেয়েছেন, যা গ্রহণযোগ্য হয়নি।
একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংক রেজল্যুশন আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী প্রথম ধাপে প্রায় ১২শ কোটি টাকা বা মোট অর্থের সাড়ে ৭ শতাংশ পরিশোধ করতে হবে। এরপর দুই বছরের মধ্যে বাকি সাড়ে ৯২ শতাংশ অর্থ ফেরত দিতে হবে। এর পাশাপাশি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতিও পূরণ করতে হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে পারলেই কেবল ব্যাংক দুটি আবার স্বতন্ত্রভাবে পরিচালনার সুযোগ পেতে পারে কিন্তু আবেদনপত্রে এমন কোনো নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দেখানো হয়নি। এই কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক আবেদনটি গ্রহণযোগ্য মনে করেনি।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে সরকারি মালিকানায় পরিচালনা করা হবে কি না—এ বিষয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এভাবে চালাতে হলে আগামী বাজেটে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন হবে। বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে। এদিকে জানা গেছে, আইন সংশোধনের সময় যুক্ত হওয়া ১৮(ক) ধারাটি ভবিষ্যতে বাতিল করার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। দুই দফায় প্রায় ১১ জন কর্মকর্তা অংশ নেন। আগামী সপ্তাহেই নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ হতে পারে বলে জানা গেছে।
২০২৫ সালে ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হয়। পরে এটি সংশোধন করে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬ কার্যকর করা হয়। এই আইনের আওতায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি নামে একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠিত হয়।
ব্যাংকটির মূলধন ধরা হয় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক আমানত বিমা তহবিল থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত দিয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। সরকারের দেওয়া অর্থের একটি অংশ আবার ঋণ হিসেবে ফেরত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যাশিত তারল্য সহায়তাও এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।
পাঁচটি ব্যাংকে বর্তমানে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী রয়েছেন। তাদের মোট আমানত প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্কিমের মাধ্যমে অর্থ ফেরতের ঘোষণা দিয়েছে। এই ব্যবস্থায় প্রথমে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এরপর বেশি অর্থ থাকা আমানতকারীদের কিস্তিতে টাকা তুলতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় পুরো অর্থ তুলতে সর্বোচ্চ ২৪ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে বাস্তবে অনেক আমানতকারী এখনো ঘোষিত নিয়ম অনুযায়ী অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না। এছাড়া আগের সুদহার থেকে কিছু অংশ কেটে রাখার সিদ্ধান্তও এখনো বাতিল হয়নি, যা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে।
ভুক্তভোগী ব্যাংক আমানতকারী অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসচিব আলিফ রেজা বলেন, ঘোষিত নির্দেশনা অনুযায়ী অর্থ ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সাধারণ আমানতকারীরা নিজেদের টাকা থাকা সত্ত্বেও সংকটে আছেন। তিনি জানান, আগামী মাসে আবারও কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে, যার মধ্যে ব্যাংক ঘেরাওয়ের মতো পদক্ষেপও থাকবে।

