দেশের আর্থিক খাতজুড়ে এখন গভীর আস্থাহীনতা। ব্যাংক, শেয়ারবাজার, বিমা, লিজিং কোম্পানি থেকে শুরু করে সমবায়—প্রায় প্রতিটি সঞ্চয়মাধ্যম নিয়েই সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। কোথাও আমানতের নিরাপত্তা নেই, কোথাও বিনিয়োগের নিশ্চয়তা নেই। ফলে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী ও মধ্যবিত্ত মানুষের সামনে তৈরি হয়েছে নিরাপদ বিনিয়োগ সংকট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা এবং আর্থিক খাতের সুশাসনের অভাব মিলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে শুধু বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হয়নি, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ কয়েক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মোট বিতরণ করা ঋণের বড় অংশই এখন অনাদায়ী। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা, কারণ দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃত তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে অনেক ব্যাংকের বিরুদ্ধে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকটি বড় ও তুলনামূলক শক্তিশালী ব্যাংক ছাড়া অধিকাংশ ব্যাংকই ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক ব্যাংকে গ্রাহকরা নিজেদের জমা টাকা তুলতে গিয়ে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছেন। কোথাও দিনে নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি টাকা তোলা যাচ্ছে না, কোথাও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট এখন আস্থার সংকট। মানুষ যদি মনে করে ব্যাংকে রাখা টাকা নিরাপদ নয়, তাহলে পুরো অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কারণ সঞ্চয় কমে গেলে বিনিয়োগ কমে, উৎপাদন কমে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়।
ব্যাংকের বাইরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থাও ভয়াবহ। একসময় যেসব লিজিং ও ফাইন্যান্স কোম্পানি উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের আমানত সংগ্রহ করত, তাদের অনেকগুলো এখন কার্যত ধ্বংসের মুখে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকের হাজার হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। অনেকে বছরের পর বছর ঘুরেও জমা অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না।
অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, ভুয়া ঋণ বিতরণ ও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ফলে আমানতকারীরা এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় আছেন।
শেয়ারবাজারের পরিস্থিতিও বিনিয়োগকারীদের হতাশ করছে। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে স্থিতিশীলতা নেই। অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম ধারাবাহিকভাবে কমছে। মৌলভিত্তিসম্পন্ন অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারেও ক্রেতা মিলছে না। এতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার কারসাজি, দুর্বল তদারকি এবং তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির নিম্নমানের আর্থিক প্রতিবেদন বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করেছে। অনেকেই মনে করছেন, শেয়ারবাজার এখন বিনিয়োগের জায়গা নয়, বরং পুঁজি হারানোর ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও অনাস্থা বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে অর্থ তুলে নিয়েছেন। এতে বাজারে আরও চাপ তৈরি হয়েছে। একসময় দেশের লাখ লাখ মানুষ শেয়ারবাজারে সক্রিয় থাকলেও এখন সেই অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিমা খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। জীবনবিমা কিংবা সাধারণ বিমা—দুই ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের বড় অংশ সময়মতো দাবি পরিশোধ পাচ্ছেন না। বিশেষ করে জীবনবিমার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর টাকা তুলতে গিয়ে গ্রাহকদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক বিমা কোম্পানি গ্রাহকের অর্থ দীর্ঘদিন ধরে অন্য খাতে ব্যবহার করেছে। কোথাও সুশাসনের অভাব, কোথাও দুর্বল ব্যবস্থাপনা, আবার কোথাও মালিকপক্ষের অনিয়ম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে বিমা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে।
একসময় গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের বড় ভরসা ছিল সমবায় খাত। কৃষি, মৎস্য, আবাসন ও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে এই খাতের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় খাতটি ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।
অনেক সমবায় প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ, হিসাব জালিয়াতি এবং অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ সমবায়ের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নজরদারি ও জবাবদিহি না থাকলে এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা কঠিন হবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, আর্থিক খাতে আস্থা ফেরাতে সবচেয়ে জরুরি হলো সুশাসন নিশ্চিত করা। যারা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
তাদের মতে, শুধু নতুন নীতিমালা করলেই হবে না, বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে কঠোরভাবে। অন্যথায় সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ও বিনিয়োগ থেকে আরও দূরে সরে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

