দেশের ব্যাংক খাতে আর্থিক দুর্বলতা আরও গভীর হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে ২০টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকায়। যদিও আগের প্রান্তিকের তুলনায় সামান্য কমেছে এই ঘাটতি, অর্থনীতিবিদরা বলছেন—এটি বাস্তব উন্নতি নয়, বরং পুনঃতফসিল নীতির কারণে তৈরি হওয়া সাময়িক স্বস্তি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে কিছুটা কমলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত, ইসলামী ও শেষ প্রজন্মের কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে সংকট প্রকট আকার নিয়েছে।
ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি বলতে বোঝায়—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধনের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়া। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে ব্যাংককে নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু দেশের অনেক ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই সেই সক্ষমতা হারাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন, দুর্বল তদারকি, অনিয়ন্ত্রিত ঋণ বিতরণ এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মের ফলেই ব্যাংক খাত আজ গভীর সংকটে পড়েছে। ফলে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমছে, বিদেশি অর্থায়নের ওপর চাপ বাড়ছে এবং পুরো অর্থনীতির স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও বা সিআরএআর নেমে গেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই হার কমপক্ষে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকার কথা। অর্থাৎ অধিকাংশ দুর্বল ব্যাংক ঝুঁকি মোকাবিলার ন্যূনতম সক্ষমতাও ধরে রাখতে পারছে না।
একই সময়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিপুল খেলাপি ঋণই মূলধন ঘাটতির বড় কারণ।
চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি জনতা ব্যাংকের। এরপর রয়েছে অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক। বহু বছর ধরে সরকারি সহায়তা ও করদাতার অর্থে মূলধন জোগান দেওয়ার পরও এসব ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়নি।
সবচেয়ে বড় সংকট দেখা গেছে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে। সাতটি ইসলামী ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটির বেশি। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংকের ঘাটতি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশও মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।
বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংকও গুরুতর সংকটে রয়েছে। এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংকসহ সাতটি বেসরকারি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার কোটির বেশি।
এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও দুর্বল। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকও বড় ধরনের ঘাটতিতে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, পুনঃতফসিল নীতির কারণেই তিন মাসে ঘাটতি কিছুটা কমেছে। খেলাপি ঋণের একটি অংশ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে নিয়মিত দেখানো হওয়ায় প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ কমেছে। এতে মূলধনের ওপর চাপও সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা এটিকে “কৃত্রিম উন্নতি” হিসেবে দেখছেন। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে বাস্তব সংকট আড়াল করা হচ্ছে। যেসব ব্যাংক আগে দুর্বল ছিল, তারা এখনো একই অবস্থায় রয়েছে। তার ভাষায়, মূলধন ঘাটতি থাকা কোনো ব্যাংকের জন্যই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তিনি মনে করেন, বারবার পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া ব্যাংকিং খাতে নৈতিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কারণ এতে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা উৎসাহিত হয় এবং সৎ ঋণগ্রহীতারা নিরুৎসাহিত হন। ঋণ শোধ না করেও সুবিধা পাওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হওয়ায় আর্থিক শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ড. জাহিদ হোসেনের মতে, পুনঃতফসিলের পরিবর্তে অকার্যকর ঋণ দ্রুত রাইট-অফ করা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ঋণ ব্যবস্থাপনা চালু করাই হতে পারে টেকসই সমাধান। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, দ্রুত কার্যকর সংস্কার না হলে ব্যাংক খাতের এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। এতে শুধু আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়, বিনিয়োগ, শিল্প উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।

