নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাক খাতের ২৬ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া বিক্রয়চুক্তি ও অনিয়মিত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলে প্রায় ৩ হাজার ৮১ কোটি টাকার আর্থিক দায় সৃষ্টি করা হয়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে একটি বেসরকারি ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, তাদের অজান্তে এসব দায় তৈরি করা হয়েছে এবং এখন তা তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে।
ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ব্যাংকের স্থানীয় শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তার সমন্বিত অনিয়মের মাধ্যমে এই বিশাল অঙ্কের ঋণ ও দায় তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
রাজধানীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা জানান, মোট ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের নামে দায় সৃষ্টি করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৬টি রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানা এবং বাকিগুলো দেশীয় বাজারে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। তারা বলেন, ভুয়া কাগজপত্র, অনুমোদনবহির্ভূত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং কৃত্রিম এলসি ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব দায় তৈরি করা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত রপ্তানি বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছাড়াই ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে বড় অঙ্কের দায় দেখানো হয়েছে। পরে সেই দায় সমন্বয়ের নামে উদ্যোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত ঋণ ও ‘জোরপূর্বক দায়’।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ঋণসীমা ও প্রকৃত দায়ের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত সীমা ছিল ৫৯ কোটি টাকা, অথচ তার নামে দায় দেখানো হয়েছে ৩৪৫ কোটি টাকা। আরেকটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৩ কোটি টাকার সীমা থাকলেও দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭০ কোটি টাকায়।
ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে এই অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পদ্ধতিতে সাধারণত রপ্তানি আদেশের বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির জন্য ব্যাংক অর্থায়ন করে। তবে তদন্তে প্রশ্ন উঠেছে—অনেক ক্ষেত্রে আদৌ প্রকৃত রপ্তানি হয়েছে কি না।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠানের আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে বড় অসামঞ্জস্য রয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রায় ১৯৫ মিলিয়ন ডলারের আমদানি দেখানো হলেও রপ্তানি ছিল মাত্র ৪৮ মিলিয়ন ডলার। নীতিমালা অনুযায়ী এ ধরনের ব্যবধান অস্বাভাবিক।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, ব্যাংক কর্মকর্তারা জাল পরিচয়পত্র, ভুয়া চুক্তি এবং অনিয়মিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ব্যবহার করে এই আর্থিক জটিলতা তৈরি করেছেন। তাদের দাবি, প্রকৃত হিসাব এখনো তাদের কাছে প্রকাশ করা হয়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন বলে উদ্যোক্তারা জানান। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, চলমান সংকট সমাধান না হলে কারখানা বন্ধ হয়ে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বেন। উদ্যোক্তারা সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি একটি স্বাধীন নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দিয়ে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক অডিট এবং হিসাব পুনর্মিলনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি জানান, অনেক উদ্যোক্তাই এসব দায় সম্পর্কে জানতেন না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এত বড় অঙ্কের দায় সৃষ্টি হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের নজরদারি কেন কার্যকর হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক মুখপাত্র বলেন, এখানে প্রতারণার বিষয়টি স্পষ্ট। তবে এটি ব্যাংক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে হয়েছে, নাকি গ্রাহকরা পরে দায় অস্বীকার করছেন—তা বিস্তারিত তদন্তে নির্ধারণ করতে হবে।
একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র জানায়, ছয়টি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে এবং প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক দায় শনাক্ত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২৬টি প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত তথ্যও চেয়েছে। ব্যাংকটির নারায়ণগঞ্জ শাখা বর্তমানে বড় আর্থিক চাপে রয়েছে এবং ঋণের বড় অংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেও বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা পর্ষদ ২০২৫ সালের শুরুতে পরিবর্তিত হয় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে পুনর্গঠন করে। বর্তমান ব্যবস্থাপনা জানিয়েছে, যেসব নথিতে উদ্যোক্তাদের স্বাক্ষর রয়েছে, তার ভিত্তিতেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অনিয়মের উৎস খুঁজে বের করা হবে বলেও তারা উল্লেখ করেছেন।

