চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কায় পড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই সময়ের ব্যবধানে ব্যাংকটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এক বছর আগেও একই সময়ে মুনাফায় থাকা ব্যাংকটির এমন হঠাৎ অবনতি ব্যাংক খাতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ব্যাংকটির প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূলত সুদ আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে সুদ ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিচালন আয় ও শেয়ারপ্রতি আয়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে রূপালী ব্যাংকের নিট লোকসান হয়েছে ৩৯৬ কোটি টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি ২১ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪১৭ কোটি টাকার নেতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে।
সুদ আয়ের খাতেও বড় পতন দেখা গেছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংকটির সুদ আয় হয়েছে ৬৫৮ কোটি টাকা। কিন্তু একই সময়ে আমানত ও অন্যান্য দায়ের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। ফলে সুদ আয় ও সুদ ব্যয়ের মধ্যে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির সুদ আয় ছিল ৮৫৯ কোটি টাকা, আর সুদ পরিশোধ করতে হয়েছিল ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা।
অর্থাৎ একদিকে আয় কমেছে, অন্যদিকে ব্যয় বেড়েছে। ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ এবং দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক ব্যাংকই এখন সুদ ব্যয়ের চাপে রয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এই চাপ তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।
পরিচালন কার্যক্রমেও বড় ধাক্কা খেয়েছে রূপালী ব্যাংক। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ৮৪ কোটি টাকা। অথচ আগের বছরের একই সময়ে পরিচালন মুনাফা ছিল ৩০৬ কোটি টাকা। এতে বোঝা যাচ্ছে, ব্যাংকটির মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম থেকেই আয় কমে গেছে।
লোকসানের প্রভাব পড়েছে শেয়ারপ্রতি আয়ের হিসাবেও। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৮ টাকা ১২ পয়সা। আগের বছর একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ১৩ পয়সা। একই সঙ্গে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্যও কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ টাকা ৫ পয়সায়।
গত কয়েক বছরের আর্থিক চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, রূপালী ব্যাংকের মুনাফা ও লভ্যাংশ ধারাবাহিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ২০২৫ হিসাব বছরেও বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। ওই বছরে ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল মাত্র ১৪ পয়সা। এর আগের বছরও কোনো লভ্যাংশ দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালে শেয়ারপ্রতি আয় নেমে আসে ২৩ পয়সায়, যা তার আগের বছরে ছিল ১ টাকা ২৮ পয়সা।
সবশেষ ২০২৩ সালে বিনিয়োগকারীদের ৫ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দিয়েছিল ব্যাংকটি। তবে এরপর থেকে আয় কমতে কমতে এখন লোকসানে পৌঁছেছে প্রতিষ্ঠানটি।
ব্যাংক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন এবং কম উৎপাদনশীল সম্পদের চাপে রয়েছে। ফলে সুদ আয় কমে যাচ্ছে, কিন্তু আমানতের বিপরীতে ব্যয় কমানো যাচ্ছে না। এর প্রভাব সরাসরি মুনাফায় পড়ছে।
রূপালী ব্যাংকের শেয়ারধারণ কাঠামোতেও সরকারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ব্যাংকটির মোট শেয়ারের প্রায় ৯০ শতাংশ সরকারের হাতে। বাকি অংশ রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে। বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৪৮৮ কোটি টাকা এবং রিজার্ভে রয়েছে ৫৩৮ কোটি টাকার বেশি।
ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ক্রেডিট রেটিংস ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি রেটিং ‘বিবিবি প্লাস’ এবং স্বল্পমেয়াদি রেটিং ‘এসটি-থ্রি’ নির্ধারণ করেছে। তবে সাম্প্রতিক লোকসানের কারণে ভবিষ্যতে ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মঙ্গলবার ব্যাংকটির শেয়ার ১৬ টাকায় লেনদেন হয়েছে। গত এক বছরে শেয়ারটির দাম ১৫ টাকা ২০ পয়সা থেকে ২৫ টাকা ৯০ পয়সার মধ্যে ওঠানামা করেছে। সাম্প্রতিক আর্থিক দুর্বলতার কারণে শেয়ারবাজারেও ব্যাংকটি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থান দেখা যাচ্ছে।

