ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মধ্যেই আবারও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিগত ছাড় দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানো, বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু করা এবং খেলাপি ঋণের চাপ কমাতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও খাতসংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছেন, অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে এ ধরনের শিথিল নীতির সুযোগ নিয়ে অসাধু গ্রাহক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী সুবিধা আদায় করতে পারে। ফলে ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান সংকট আরও জটিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের কারণে আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে। সরকার পরিবর্তনের পর প্রকৃত আর্থিক চিত্র প্রকাশ্যে আসতে শুরু করলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়। একই সঙ্গে দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকট, তারল্য ঘাটতি এবং আমানত ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ে। এমন বাস্তবতায় কঠোর তদারকির প্রত্যাশা থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে নমনীয় অবস্থান নিয়েছে।
ব্যাংকারদের মতে, অতীতে বিশেষ সুবিধার আওতায় দেওয়া ঋণ পুনঃতপশিল, স্বল্পসুদের প্রণোদনা এবং নানামুখী ছাড়ের কারণে অনেক বড় ঋণগ্রহীতা দায়বদ্ধতার বাইরে থেকে গেছেন। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় বাস্তবায়িত বিপুল অঙ্কের প্রণোদনা কর্মসূচির কিছু সুবিধা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তে অপব্যবহারের অভিযোগের মুখে পড়ে। সেই অভিজ্ঞতার পরও নতুন করে বৃহৎ প্রণোদনা তহবিল চালুর সিদ্ধান্ত প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ ঝুঁকির দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ এক বছরে বেড়ে প্রায় ১০ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। একই সময়ে ব্যাংক খাতে নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সামগ্রিক মূলধন পরিস্থিতি ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে গেছে। অনেক ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠন, ঋণ আদায় জোরদার করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় আবারও নমনীয়তা বাড়ানো হচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনঃতপশিলের বিশেষ সুবিধার মেয়াদ বাড়িয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় খুব কম পরিমাণ অর্থ জমা দিয়েই দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পুনর্গঠন করা যাচ্ছে। গ্রাহকরা দুই বছরের ছাড়কালসহ দীর্ঘ সময়ের জন্য ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ পাচ্ছেন। ব্যাংকারদের একাংশের অভিযোগ, এতে প্রকৃত অর্থে ঋণ আদায়ের গতি কমে যাচ্ছে। অনেক ঋণগ্রহীতা নতুন সুবিধার অপেক্ষায় কিস্তি পরিশোধে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
অন্যদিকে একক গ্রাহকের ঋণসীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের শিথিলতা আনা হয়েছে। নতুন নিয়মে ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ একজন গ্রাহক বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে ঋণ দিতে পারবে। সমালোচকদের মতে, ব্যাংক খাতে বড় ঋণখেলাপিদের আধিপত্য বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত ঝুঁকি বাড়াতে পারে। কারণ অতীতেও সীমিতসংখ্যক বৃহৎ গ্রাহকের ঋণ অনাদায়ী হয়ে যাওয়ায় বহু ব্যাংক সংকটে পড়েছে।
ঋণ খেলাপিদের ওপর আরোপিত দণ্ড সুদের হারও কমিয়ে আনা হয়েছে। আগে বকেয়া ঋণ পরিশোধে চাপ তৈরি করতে তুলনামূলক বেশি হারে অতিরিক্ত সুদ ধার্য করা হতো। এখন সেই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধে শৃঙ্খলা রক্ষার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, খেলাপি হওয়ার আর্থিক মূল্য কমে গেলে অনেক গ্রাহক সময়মতো ঋণ পরিশোধে আগ্রহ হারাতে পারেন।
এদিকে উৎপাদনশীল খাতকে চাঙা করতে এবং বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার নতুন প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়েছে। এই তহবিল থেকে ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক কম সুদে ঋণ পাবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এর ফলে শিল্প উৎপাদন বাড়বে এবং অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সহজ শর্তে ঋণ দিলেই বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবার সচল হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। অনেক কারখানা বাজার সংকট, ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা, জ্বালানি ঘাটতি কিংবা উৎপাদন ব্যয়ের চাপের কারণে বন্ধ হয়েছে। এসব মৌলিক সমস্যার সমাধান ছাড়া নতুন ঋণ অনেক ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে।
তাদের মতে, শিল্প ও ব্যবসা পুনরুজ্জীবনে প্রণোদনার পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ, অবকাঠামো উন্নয়ন, নীতিগত স্থিতিশীলতা, বাজার সম্প্রসারণ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় নতুন অর্থায়ন কেবল ঋণের বোঝা বাড়াবে, কিন্তু উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য বলছে, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অবস্থান থেকে তারা সরে আসেনি। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও শিল্পকে সহায়তা করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি-সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। অনিয়ম ও জালিয়াতি ঠেকাতে তদারকি জোরদার করা হয়েছে এবং ব্যাংকগুলোকে কঠোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
তবু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—অতীতের মতো আবারও কি নীতিগত ছাড়ের সুযোগে কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠী লাভবান হবে, নাকি এবার সত্যিই ব্যবসা ও শিল্প খাত পুনরুদ্ধারে কার্যকর ফল মিলবে? ব্যাংক খাতের বর্তমান নাজুক অবস্থার প্রেক্ষাপটে সেই উত্তরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

