দেশের কমতে থাকা প্রবৃদ্ধি, স্থবির বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ সংকট মোকাবিলায় বড় আকারের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
‘অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি-২০২৬’ নামে ঘোষিত এই উদ্যোগের আওতায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ও পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও রপ্তানি খাতে নতুন গতি ফিরিয়ে আনা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনীতির গতি কমে যাওয়ায় উৎপাদন ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বন্ধ শিল্পকারখানা চালু হওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেবল বড় অঙ্কের তহবিল ঘোষণা করলেই হবে না। কার্যকর বাস্তবায়ন এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২৩ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৫ অর্থবছরে তা কমে আনুমানিক ৩ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতেই অর্থনীতিতে নতুন উদ্দীপনা তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল দুই ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে ৪১ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা আসবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা থেকে।
প্রথম ধাপে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতকে। এ খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া কৃষি ও গ্রামীণ কার্যক্রমে ১০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উত্তরবঙ্গ কৃষি হাব উন্নয়নে পৃথকভাবে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
দ্বিতীয় ধাপের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে রপ্তানি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শিপমেন্ট-পূর্ব রপ্তানি ঋণের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আরও ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া চামড়াজাত পণ্য, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি, বৈদেশিক কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ এবং সবুজ অর্থনীতির জন্যও পৃথক তহবিল রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই কর্মসূচির আওতায় বেসরকারি খাত গড়ে ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে। ব্যবসায়ীদের স্বল্প সুদে ঋণ দিতে সরকার ৬ শতাংশ হারে ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনাও করেছে।
ঋণ বিতরণ ব্যবস্থায়ও নতুন কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ পাবে, তাদের কার্যক্রমে ব্যাংক কর্মকর্তাদের তদারকি থাকবে। পাশাপাশি কোনো ব্যবসায়ী সংগঠন যদি কোনো কারখানা চালুর বিষয়ে অনাপত্তি দেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সহজে ঋণ সুবিধা পেতে পারে। এতে প্রণোদনার অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতীতের বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচিতে অর্থ অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার বাড়তি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বর্তমানে ঋণ বিতরণের শর্ত ও সুবিধাভোগী নির্ধারণে নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। ঈদুল আজহার পর সেটি প্রকাশ করা হতে পারে। এরপর ব্যবসায়ীরা ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে বড় অঙ্কের এই কর্মসূচিও প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে। অতীতে অনেক প্রণোদনা তহবিল কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এবার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর মহিউদ্দিন রুবেল বলেছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে শিল্প, কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও রপ্তানি খাতে সমন্বিত সহায়তা এখন জরুরি। তার মতে, পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উৎপাদন বাড়বে, নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং প্রায় ২৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগ থেকে সরে এসেছেন। এর প্রভাব পড়েছে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। যা গত ২৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো এখন ব্যবসায়িক ঋণের তুলনায় সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
এদিকে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে আমদানিতেও। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ সময়ে শিল্পকারখানার মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়া এবং শিল্পকারখানা বন্ধ থাকার প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও স্পষ্টভাবে পড়ছে।

