দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি আবারও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা পেয়েছে। চলমান তারল্য সংকট মোকাবিলায় আজ ২,৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন। এর আগের দিনও একই পরিমাণ অর্থ সহায়তা পেয়েছিল ব্যাংকটি।
ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গতকাল পাওয়া অর্থ এখনো পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়নি। গ্রাহকদের নগদ উত্তোলনের চাপ সামাল দিতে এবং স্বাভাবিক লেনদেন সচল রাখতে এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু গ্রাহক আমানত তুলে নিলেও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। তার মতে, ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে এবং এটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, একটি বড় শাখার তথ্য অনুযায়ী হিসাব বন্ধের হার আগের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে এসেছে, যা আস্থার পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়।
ব্যাংক খাতে চলমান অনিশ্চয়তা এবং নগদ উত্তোলনের চাপের মধ্যেই ইসলামী ব্যাংককে ধারাবাহিকভাবে তারল্য সহায়তা দিতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ধারাবাহিক সহায়তা সাধারণত তখনই দেওয়া হয় যখন কোনো বড় ব্যাংকে স্বল্পমেয়াদি তারল্য ঘাটতি তৈরি হয় এবং আমানতকারীদের আস্থা রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন হয়।
এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। ওই সিদ্ধান্তের ফলে চেয়ারম্যানসহ বিদ্যমান বোর্ডের সদস্যরা দায়িত্ব থেকে বাদ পড়েন। ব্যাংকে চলমান অস্থিরতা, আমানত উত্তোলনের চাপ এবং অনিশ্চয়তা বাড়ার প্রেক্ষাপটেই এই প্রশাসনিক পরিবর্তন আনা হয় বলে জানা যায়।
পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ নির্বাহীকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার দায়িত্ব হলো ব্যাংকের পরিচালন কাঠামো পুনর্গঠন, তারল্য ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক করা এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি বড় ব্যাংকে ধারাবাহিক তারল্য সহায়তা এবং প্রশাসনিক পরিবর্তন সাধারণত আর্থিক ব্যবস্থার ভেতরে চাপের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে যখন আমানতকারীদের মধ্যে আস্থা হ্রাস পায়, তখন ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলনের প্রবণতা বেড়ে যায় এবং সেটি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়।
তারা আরও মনে করছেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা পুনর্গঠন। কারণ একবার আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় তারল্য ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে নতুন করে আমানত প্রবাহ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ধারাবাহিক তারল্য সহায়তা ব্যাংকটির জন্য স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি আনলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিচালনাগত স্বচ্ছতা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা জরুরি হবে। না হলে একই ধরনের চাপ বারবার তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

