চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে টানা বিতর্ক, গ্রাহকদের উদ্বেগ এবং ব্যাংক খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের প্রকাশ্য উৎকণ্ঠার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপকে দেশের সবচেয়ে বড় শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকটির কার্যক্রমে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বুধবার নির্বাহী পরিচালক মো. আশরাফুল আলমকে ইসলামী ব্যাংকের পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত জানায়। নতুন দায়িত্বে তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির বৈঠকে অংশ নেবেন এবং প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। একই সঙ্গে ব্যাংকের অবস্থা, সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়মিত তথ্য ও পর্যবেক্ষণ প্রদান করবেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম সুরক্ষিত রাখা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বৃহত্তর জনস্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কোনো ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ সাধারণত নিয়ন্ত্রক সংস্থার বাড়তি নজরদারির ইঙ্গিত বহন করে এবং এটি ব্যাংকের কার্যক্রম আরও ঘনিষ্ঠভাবে তদারকির সুযোগ তৈরি করে।
পর্যবেক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্তের আগে ব্যাংক খাতে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে উদ্বেগ আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। দেশের ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) এ বিষয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানায়। সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, ইসলামী ব্যাংকে চলমান অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার দ্রুত সমাধান হওয়া পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্যই ইতিবাচক হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠকের পর এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান নয়; দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বিপুলসংখ্যক গ্রাহক, বিশাল আমানতভিত্তি এবং বৃহৎ শাখা নেটওয়ার্কের কারণে ব্যাংকটির যেকোনো সংকট পুরো খাতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে অনেকেই সতর্কতামূলক এবং স্থিতিশীলতা রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনীত স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই দিন রাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে এই নিয়োগের পরপরই একদল গ্রাহক আপত্তি জানিয়ে আন্দোলনে নামে।
সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলনকারীরা রাজধানীর দিলকুশায় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছেন। তাদের দাবি, চেয়ারম্যান নিয়োগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বিষয়টি শুধু ব্যাংকের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক অধিবেশনে ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বাকবিতণ্ডা দেখা যায়।
এর মধ্যেই ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং আন্দোলনের প্রভাবে গত এক সপ্তাহে গ্রাহকেরা পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ উত্তোলন করেছেন। ফলে গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে ব্যাংকটির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা বা ঋণ চেয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। ব্যাংকিং খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক লেনদেন নিশ্চিত করাই বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ। ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সামগ্রিক শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা, আগামী কয়েক সপ্তাহের পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে ব্যাংকটি কত দ্রুত বর্তমান সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে।

