রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে নগদ অর্থ না পাওয়ার ঘটনায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ঈদ-পরবর্তী সময়ে যখন নগদ টাকার চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকে, ঠিক তখনই অনেক গ্রাহক প্রয়োজনীয় অর্থ উত্তোলনে ব্যর্থ হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি কোনো তারল্য বা প্রযুক্তিগত সংকট নয়; বরং নগদ অর্থের সরবরাহ ও প্রবাহে সাময়িক চাপের ফল।
বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক এটিএম বুথে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও বুথ বন্ধ রয়েছে, আবার কোথাও লেনদেন চালু থাকলেও নগদ অর্থ নেই। বিজয় সরণি এলাকার কয়েকটি বুথে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন গ্রাহকেরা। অনেকে একাধিক স্থানে চেষ্টা করেও টাকা তুলতে পারেননি।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের হিসাবভিত্তিক অর্থ বা ডিজিটাল ফান্ডে কোনো ঘাটতি নেই। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তর, আন্তঃব্যাংক লেনদেন এবং শাখাভিত্তিক অধিকাংশ সেবা স্বাভাবিকভাবে চলছে। সংকট দেখা দিয়েছে মূলত এটিএম বুথে সরবরাহযোগ্য নগদ অর্থে।
খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ নগদ নোট সরবরাহ না পাওয়ার কারণে কিছু ব্যাংক সাময়িক চাপে পড়েছে। বিশেষ করে কোরবানি ঈদকে ঘিরে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ মানুষের হাতে চলে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর এটিএম নেটওয়ার্কে নগদ সরবরাহ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এহতেশামুল হক খান জানিয়েছেন, ডাচ-বাংলা ব্যাংকের কোনো ধরনের তারল্য সংকট নেই। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও লেনদেন কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে তিনি সরাসরি মন্তব্য করেননি।
গ্রাহকদের অভিজ্ঞতায়ও পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। কেউ বাজারে যাওয়ার আগে বুথ থেকে টাকা তুলতে না পেরে বিকল্প উপায়ে লেনদেন করতে বাধ্য হয়েছেন। আবার কেউ রাজধানীর একাধিক এলাকায় ঘুরেও প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সংগ্রহ করতে পারেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অসংখ্য অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন গ্রাহকেরা।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সৃষ্ট আলোচনা ও অর্থ উত্তোলনের চাপের কারণে ব্যাংক খাত নিয়ে সাধারণ মানুষের সংবেদনশীলতা বেড়েছে। ফলে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মতো বড় ও জনপ্রিয় ব্যাংকের এটিএমে নগদ অর্থ না পাওয়ার ঘটনা অনেকের মধ্যে বাড়তি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নে এটিএমে নগদ অর্থের সাময়িক ঘাটতি এবং ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার সংকট—এই দুটি বিষয়কে আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে মোট মুদ্রার কোনো ঘাটতি নেই। বরং ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে। কোরবানির পশু কেনাবেচা, বেতন-ভাতা উত্তোলন এবং উৎসবকেন্দ্রিক লেনদেনের কারণে নগদ অর্থের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে এটিএম বুথগুলোতে দ্রুত অর্থ পুনঃসরবরাহ করা অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস শেষে সাধারণ মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। মাত্র দুই মাস আগেও এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৩ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে গেছে।
অন্যদিকে গত কয়েক বছরে নতুন নোট মুদ্রণের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানোও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন। রাজনৈতিক পরিবর্তন, নতুন নোটের নকশা প্রণয়ন, বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং নতুন স্বাক্ষরযুক্ত নোট বাজারে ছাড়ার সময়ক্ষেপণের কারণে প্রয়োজনীয় হারে নতুন মুদ্রা সরবরাহ সম্ভব হয়নি। ফলে নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দেশের অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলে সেই অনুপাতে মুদ্রা সরবরাহও বাড়াতে হয়। নতুন নোটের নকশা, মুদ্রণ এবং বাজারে সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাধারণত কয়েক মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লাগে। ফলে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ঘাটতি পূরণ করা সবসময় সম্ভব হয় না।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মুদ্রার কোনো সংকট নেই। ঈদের কারণে সৃষ্ট অস্থায়ী পরিস্থিতির ফলে নগদ অর্থের প্রবাহে চাপ দেখা দিয়েছে মাত্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, ছুটি শেষে মানুষ ধীরে ধীরে ব্যাংকে অর্থ জমা দিতে শুরু করলে নগদ অর্থের প্রবাহ স্বাভাবিক হবে এবং এটিএম বুথগুলোর পরিস্থিতিও দ্রুত উন্নতি করবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নগদ অর্থের সরবরাহ ও প্রবাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে। একই সঙ্গে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় মুদ্রা সরবরাহ নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মূলত নগদ অর্থের সাময়িক সরবরাহচাপের প্রতিফলন। ডিজিটাল লেনদেন, অনলাইন ব্যাংকিং এবং আন্তঃব্যাংক অর্থ স্থানান্তর স্বাভাবিক থাকায় এটি কোনো কাঠামোগত আর্থিক সংকটের ইঙ্গিত নয়। তবে গ্রাহকদের আস্থা অটুট রাখতে দ্রুত এটিএম বুথগুলোতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।

