মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যুদ্ধের বিস্তার, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কায় ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্ব অর্থনীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়তে পারে, যা আগের পূর্বাভাসের তুলনায় কম।
বিশ্বব্যাংকের অর্ধবার্ষিক ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হলে এবং জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে নতুন অস্থিরতা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও ভোক্তা আস্থার ওপরও গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির পর এটিই বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাসগুলোর একটি। যদিও ২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি তুলনামূলক ভালো অবস্থানে ছিল, চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সেই গতি অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এই পথটি বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হওয়ায় এর ওপর যে কোনো চাপ সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু পরিবহন বা শিল্পখাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতি নতুন করে মাথাচাড়া দিচ্ছে। এতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখতে বা আরও বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধীর করে দিতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সার বাজারেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সারের দাম বৃদ্ধি পেলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দামে প্রভাব ফেলে। এর ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনের মূল পূর্বাভাসে ধরা হয়েছে, চলতি বছরে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় মূল্য ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯৪ ডলারের কাছাকাছি থাকবে। একই সঙ্গে আশা করা হয়েছে, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের আশপাশে অবস্থান করবে।
তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ভিন্ন চিত্র দেখা দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ঝুঁকি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যদি তেলের দাম গড়ে ১১৫ ডলারে পৌঁছে যায় এবং সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
আরও নেতিবাচক পরিস্থিতিতে, যেখানে জ্বালানি সংকটের সঙ্গে আর্থিক বাজারের অস্থিরতা যুক্ত হবে, তখন বিনিয়োগকারীদের আস্থা দ্রুত কমে যেতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এমন অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা কার্যত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুন সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।
বিশ্বব্যাংকের উপ-প্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেছেন, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং আর্থিক বাজারের চাপ একসঙ্গে কাজ করলে অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রা খুব দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে বৈশ্বিক অর্থনীতি এখনও বড় ধরনের ধাক্কার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
প্রতিবেদনে শুধু স্বল্পমেয়াদি ঝুঁকির কথাই নয়, দীর্ঘমেয়াদি কিছু কাঠামোগত সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিলের মতে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, সরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা, ঋণের বোঝা বৃদ্ধি এবং বিশ্ব বাণিজ্যের ধীরগতি আগামী বছরগুলোতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে থাকবে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৭ ও ২০২৮ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও তা আগের দশকের গড় প্রবৃদ্ধির তুলনায় কম থাকবে। অর্থাৎ বিশ্ব অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষাকৃত ধীরগতির প্রবৃদ্ধির বাস্তবতার মধ্যেই চলবে।
সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে উন্নয়নশীল দেশগুলো। এসব দেশের অনেকগুলোই এখনও মহামারির ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এখন নতুন করে উচ্চ সুদহার, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ তাদের অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে। বিশ্বব্যাংকের ধারণা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় প্রবৃদ্ধি চলতি বছরে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও ইউরোজোন, জাপান ও চীনে প্রবৃদ্ধি কমার আশঙ্কা রয়েছে। ইউরোপে উচ্চ জ্বালানি ব্যয় ও দুর্বল চাহিদা অর্থনৈতিক গতি কমিয়ে দিচ্ছে। একইভাবে চীনের প্রবৃদ্ধিও আগের বছরের তুলনায় নিচে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেতে পারে মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলগুলো। যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব, বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া এবং বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে ওই অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারত তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালেও ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলোর একটি থাকবে। যদিও প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কমতে পারে, তারপরও তা অধিকাংশ বড় অর্থনীতির তুলনায় অনেক বেশি থাকবে।
বিশ্বব্যাংকের এই সতর্কবার্তা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং আর্থিক অস্থিরতা যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে আগামী কয়েক বছর বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কঠিন সময় হয়ে উঠতে পারে। ফলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কূটনৈতিক উদ্যোগ, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

