বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা খাতের উন্নয়নে নতুন করে ৪০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন নিশ্চিত করেছে বিশ্বব্যাংক। ঋণ ও অনুদানের সমন্বয়ে গঠিত এই অর্থায়ন দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে ব্যয় করা হবে।
বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের মধ্যে এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী এবং বিশ্বব্যাংকের পক্ষে ঢাকাস্থ কার্যালয়ের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির আওতায় বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) বাংলাদেশকে ৩৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থায়ন তহবিল থেকে ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অনুদান দেওয়া হবে। ফলে মোট অর্থায়নের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৪০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, স্বাস্থ্য খাতের চলমান সংস্কার ও সেবার মান উন্নয়নে এই অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা বাড়ানো, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রকল্পগুলো কার্যকর অবদান রাখতে পারে।
এই অর্থায়নের একটি বড় অংশ ব্যয় হবে স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবার উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীন স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান বৃদ্ধি, চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনার দক্ষতা উন্নত করা।
বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই দুই অঞ্চলে স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও সেবার সক্ষমতা আরও বাড়ানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
অন্যদিকে অর্থায়নের আরেকটি অংশ ব্যয় হবে জলবায়ু-সহনশীল প্রজনন স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা সেবা উন্নয়ন প্রকল্পে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অধীন পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এর মাধ্যমে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, সেবার আওতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষম স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব স্বাস্থ্যসেবার ওপরও পড়ছে। ফলে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তি অনুযায়ী, ঋণের অর্থ পাঁচ বছরের অবকাশকালসহ মোট ৩০ বছরে পরিশোধ করতে হবে। ঋণের ব্যবহৃত অর্থের ওপর বার্ষিক শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে সেবা মাশুল এবং এক দশমিক ২৫ শতাংশ হারে সুদ প্রযোজ্য হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের দেওয়া ঋণের মধ্যে এই শর্তকে তুলনামূলকভাবে সহজ ও দীর্ঘমেয়াদি বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ ছাড়া অনুত্তোলিত ঋণের ওপর বার্ষিক শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে প্রতিশ্রুতি ফি প্রযোজ্য থাকলেও বিশ্বব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে এই ফি কার্যত আদায় করছে না।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ শুধু সামাজিক উন্নয়ন নয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। ফলে স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা খাতে এই নতুন অর্থায়নকে শুধু উন্নয়ন সহায়তা নয়, বরং মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের এই সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো, সেবার গুণগত মান এবং প্রজনন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন গতি সঞ্চার হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্ট মহল। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পথও সুগম হবে।

