দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে স্বাভাবিক তারল্য অবস্থা থেকে গভীর নগদ সংকটে পড়ে গেছে। নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিতর্ক, ধারাবাহিক বিক্ষোভ, আমানত উত্তোলনের চাপ এবং গ্রাহকদের মধ্যে অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকটির আর্থিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ এবং বিশেষ তারল্য সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ব্যাংক সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাব ইতিবাচক অবস্থানে ছিল। কিন্তু পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে সেই হিসাব প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ঘাটতিতে চলে যায়। ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হিসাব দৈনন্দিন লেনদেন, আন্তঃব্যাংক নিষ্পত্তি এবং গ্রাহকসেবা পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ঘাটতি তৈরি হলে অর্থ স্থানান্তর, ক্লিয়ারিং এবং অন্যান্য ব্যাংকিং কার্যক্রমে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন জানিয়েছেন, তারল্য সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। বিশেষ সহায়তা পাওয়ার পর অর্থ স্থানান্তর ও ক্লিয়ারিং কার্যক্রম আবারও স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার আমানত উত্তোলন হচ্ছে। একই সময়ে নতুন আমানতও আসছে, তবে ব্যাপক নগদ উত্তোলনের চাপ ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতিকে দুর্বল করে দিয়েছে। এ অবস্থায় শাখা পর্যায়ে গ্রাহকদের নগদ উত্তোলনে সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও কিছু গ্রাহক অভিযোগ করেছেন, নির্ধারিত সীমার চেয়েও কম অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন তারা।
পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে। পরে আরও একই পরিমাণ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রাহকদের স্বাভাবিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহে মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা কমেছে। মে মাসের শেষ দিকে আমানতের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার কোটি টাকা, যা জুনের প্রথম সপ্তাহেই নেমে আসে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায়। তারল্য সংকট মোকাবিলায় ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সহায়তাও চেয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছিলেন, ইসলামী ব্যাংকের সংকট দ্রুত সমাধান করা হবে এবং আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনে কোনো সমস্যা হতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে জরুরি তারল্য সহায়তাও দেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
পরিস্থিতির পেছনে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ২৪ মে ঈদুল আজহার ছুটির ঠিক আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাবেক চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পর সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই সিদ্ধান্তের পরপরই বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন থেকে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা চেয়ারম্যান নিয়োগ বাতিল এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পুনর্বহালের দাবি জানায়। পরবর্তী দিনগুলোতে আন্দোলন আরও জোরালো হলে পরিস্থিতি ব্যাংকের কার্যক্রম ও গ্রাহকদের আস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, কোনো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমানতকারীদের আচরণে। অনেক গ্রাহক ঝুঁকি এড়াতে দ্রুত আমানত তুলে নিতে শুরু করেন, যা তারল্য সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।
ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো খেলাপি ঋণের উচ্চ হার। ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের অর্ধেকেরও বেশি। ব্যাংকটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা বলছে, এর বড় অংশই অতীতে বিতরণ করা ঋণের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সেগুলো পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি খুবই সীমিত।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক তারল্য সংকট কেবল স্বল্পমেয়াদি নগদ সংকটের বিষয় নয়; এটি ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের চাপ এবং আস্থাজনিত সংকটের সম্মিলিত প্রতিফলন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সুশাসন, ঋণ পুনরুদ্ধার, স্বচ্ছতা এবং গ্রাহকদের আস্থা পুনর্গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
ব্যাংক খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রায় ৩ কোটি গ্রাহক, দেশের অন্যতম বৃহৎ আমানতভিত্তি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে ইসলামী ব্যাংকের স্থিতিশীলতা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক আর্থিক খাত ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই চলমান সংকট কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সমাধান করা যায়, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট সবার।

