ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন ব্যাংকটির পর্ষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন। তিনি জানিয়েছেন, যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে খুব শিগগিরই নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে। একই সঙ্গে তিনি আমানতকারী ও গ্রাহকদের ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার রাজধানীতে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অতীতের বিতর্ক বা সংকট নিয়ে পড়ে থাকার সুযোগ নেই। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষিত করা।
মোহাম্মদ জহির হোসেন জানান, পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের লক্ষ্যে যাচাই-বাছাই চলছে। এমন ব্যক্তিদের বেছে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যারা কোনো পক্ষপাত বা বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনা করতে সক্ষম হবেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তিনি এক সদস্যের অস্থায়ী পর্ষদের দায়িত্ব পালন করছেন। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো, প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্যেও যেন ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত না হয় এবং গ্রাহকসেবা অব্যাহত থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা, আমানত উত্তোলনের চাপ এবং তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংক খাতে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি বিদ্যমান পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে এবং বিশেষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
এদিকে ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন জানিয়েছেন, তারল্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সহায়তা পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক। তিনি বলেন, সহায়তা হিসেবে পাওয়া অর্থের পুরোটা এখনো ব্যবহার করতে হয়নি, যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দেয়।
আলতাফ হোসেনের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আতঙ্কের কারণে অনেক গ্রাহক আমানত তুলে নিলেও ধীরে ধীরে সেই প্রবণতা কমছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, যারা অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংক থেকে অর্থ সরিয়ে নিয়েছেন, তারা আবারও আস্থা ফিরে পেলে ব্যাংকে ফিরে আসবেন।
ব্যাংকটির একটি বড় শাখার তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগের তুলনায় হিসাব বন্ধের সংখ্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। এটি গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা পুনরুদ্ধারের একটি ইতিবাচক লক্ষণ বলে তিনি মনে করেন।
ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের মতো বৃহৎ একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের স্থিতিশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যাংকটির সঙ্গে কোটি কোটি গ্রাহক, বিপুল আমানত, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থায়ন জড়িত। ফলে নতুন পর্ষদ গঠন এবং তারল্য সহায়তার মতো পদক্ষেপগুলো গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, দীর্ঘমেয়াদে সুশাসন, স্বচ্ছতা, ঋণ পুনরুদ্ধার এবং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাই ব্যাংকটির স্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। নতুন পরিচালনা পর্ষদের সামনে তাই আস্থা পুনর্গঠন এবং আর্থিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

